A Face in the Dark [Ghost]
অন্ধকারে একটি মুখ
রাস্কিন বন্ড
অনুবাদ ঃ দেবজ্যোতি বল্লভ
গল্পটা একটা ছোট্ট ঘটনা দিয়ে শুরু করলে আমার মনে হয় আপনি গাঁইয়া মস্করার একটা আভাস পাবেন । এক রাত্তিরে একা গাঁয়ের পথ ধরে চলেছি এমন সময় লণ্ঠন হাতে এক বুড়োর সাথে দেখা । আবাক হয়ে দেখলুম লোকটা অন্ধ । ‘ও বুড়ো,’ আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘যদি দেখতেই না পাও তো খামোখা লণ্ঠন বয়ে বেড়াচ্ছ কেন ?’
‘বইছি’, সে বললে, ‘যাতে আহাম্মকগুলো
রাতবিড়েতে আমার সাথে হোঁচট না খায় তাই ।’
যে গল্পটা বলতে যাচ্ছি তার সাথে এই
ঘটনার যোগ অতি সামান্যই । তবে আমার মনে হয় এটা তার সঠিক পটভূমি নির্মাণ করবে ।
অ্যাংলো-ইণ্ডিয়ান শিক্ষক মি. অলিভার,
একদিন রাতে দেরি করে স্কুল থেকে ফিরছিলেন । স্কুলটা সিমলা হিল-স্টেশনের একপ্রান্তে
। একটা ছেলেদের ইংরেজি পাবলিক স্কুল । তাদের বেশিরভাগই সচ্ছল ভারতীয় পরিবারের— ব্লেজার,
টুপি ,টাই পড়তে অভ্যস্ত । ‘লাইফ ম্যাগাজিন’ একবার ভারতের বৈশিষ্টের কথাপ্রসঙ্গে এই
স্কুলটাকে ‘প্রাচ্যের ইটন*’ বলে উল্লেখ করেছিল ।
স্বতন্ত্রতাকে উৎসাহিত করা হয় না;
‘জনগণের নেতা’ হবার লক্ষ্যে তারা এগিয়ে যায়।
মি. অলিভার অনেককাল এই স্কুলে শিক্ষকতা করছেন । মাঝে মাঝে মনে হয় যেন অনন্তকাল, বাঁধাধরা একঘেঁয়ে রুটিনের মধ্যে দিনের পর দিন কেটে যাচ্ছে । সিমলা বাজার ও তৎসংলঘ্ন সিনেমা হল, রেস্তোঁরা স্কুল থেকে মাইল দুয়েক ।
মি. অলিভার আইবুড়ো মানুষ, সাধারণত
সন্ধ্যেবেলা শহর ঘুরে অন্ধকারের পর ফিরে আসতেন এবং পথে পাইনের জঙ্গলের শর্ট কার্টটা
নিতেন। জোরে হাওয়া বইলে পাইন গাছগুলো থেকে
বিমর্ষ ভুতুড়ে শব্দ আসত বলে বেশিরভাগ লোক মূলরাস্তাই ব্যবহার করত । তবে মি. অলিভার
নার্ভাস বা কল্পনাপ্রবণ মানুষ ছিলেন না। সে রাতে তিনি একটা ফ্যাকাশে মিটমিটে টর্চ নিয়ে
সরু বনের পথ ধরে থেমে থেমে আসছিলেন— ব্যাটারিও প্রায় শেষ।
এমন সময় কাঁপা কাঁপা আলোটা পড়ল পাথরের ওপর একলা বসে থাকা একটা ছেলের ওপর । মি. অলিভার থামলেন। সন্ধ্যে ৭ টার পরে ছেলেদের স্কুলের
বাইরে থাকার কথা নয়, আর এখন বাজে নটারও বেশি ।
‘এই ছেলে,ওখানে কি করছ ?’— রুঢ়ভাবে
জিজ্ঞেস করলেন মি. অলিভার আর বদমাশটাকে চিনতে কাছে এগিয়ে গেলেন । তবে এগোতে এগোতে মি. অলিভারের মনে হল কোথাও যেন একটা গোলমাল আছে
। ছেলেটা কাঁদছিল—মাথা নিচু করে হাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে । আর শরীরটা বারে বারে
কেঁপে উঠছিল । অদ্ভুত, শব্দহীন কান্না । মি. অলিভার রীতিমত অস্বস্তি বোধ করছিলেন ।
‘আচ্ছা আচ্ছা , হয়েছে টা কি ?’ তিনি
জিজ্ঞেস করলেন। রাগ পড়ে গিয়ে এখন উদ্বেগ ফুটে উঠেছে । ‘কাঁদছ কেন ?’
ছেলেটা উত্তর দিল না , মুখ তুলে চাইল
পর্যন্ত না। নীরবে কান্নায় ফুঁপিয়ে চলল ।
‘এই ছেলে, চলে এস, এই সময় এখানে থাকাটা
ঠিক নয় । আমাকে বল কি সমস্যা । তাকাও!’
ছেলেটা মুখ তুলল । হাত সরিয়ে শিক্ষকের
দিকে তাকাল । মি. অলিভারের টর্চের আলো ছেলেটার মুখের ওপর পড়েছে — অবশ্য যদি সেটাকে
মুখ বলা যায় ।
তার না আছে চোখ, না আছে কান, নাক,
না আছে মুখ। শুধু একটা মসৃণ গোল মাথা— স্কুলের টুপি পড়ে।
এবং গল্পটি এখানেই শেষ হওয়া উচিত
ছিল— কারণ বেশ কয়েকটি লোকের ক্ষেত্রে যাদের একই অভিজ্ঞতা হয়েছে —তারা তৎক্ষনাৎ হৃদরোগে
আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। তবে মিঃ অলিভারের ক্ষেত্রে এর শেষ এখানেই নয় ।
তার কাঁপা হাত থেকে টর্চটা পড়ে গেল
। তিনি পিছন ফিরে অন্ধের মত গাছের মধ্যে দিয়ে উর্দ্ধশ্বাসে সাহায্যের জন্য চিৎকার করতে
করতে দৌড়োতে লাগলেন । স্কুল বাড়িটার দিকে ছুটতে ছুটতে মাঝপথে দেখলেন একটা লন্ঠন । মি.
অলিভার রাতের চৌকিদারকে দেখে এত খুশি এর আগে কখনো হননি ।
তিনি হোঁচট খেয়ে চৌকিদারের কাছে
গিয়ে খাবি খেতে খেতে , অসংলঘ্নভাবে কথা বলতে লাগলেন ।
‘কি হয়েছে বাবু ?’ জিজ্ঞেস করল চৌকিদার।
‘সেখানে কোনো দুর্ঘটনা ঘটেছে ? আপনি দৌড়োচ্ছেন কেন ?’
‘আমি একটা কিছু দেখলাম— ভয়ঙ্কর কিছু
একটা— একটা ছেলে জঙ্গলে কাঁদছিল — আর তার কোনো মুখ নেই !’
‘কি মুখ নেই, বাবু?’
‘চোখ, নাক, মুখ–কিচ্ছু নেই ।’
‘বাবু, দেখুন তো এরকম কিনা ?’ এই বলে
চৌকিদার লণ্ঠনটা তার মুখের কাছে তুলে ধরল । চৌকিদারেরও চোখ নেই, কান নেই, কিছুই নেই
— এমনকি ভুরু পর্যন্ত না !
হঠাৎ দমকা হাওয়ায় লণ্ঠন্টা নিভে গেল
।
মূলগল্প ঃ A Face in the Dark
* ইটন স্কুল ও কলেজ ইংল্যান্ডের বার্কশায়ারের উইন্ডসর এর নিকটে ইটনের ছেলেদের জন্য একটি ১৩-১৮ স্বতন্ত্র বোর্ডিং স্কুল। এটি কেমব্রিজের কিং-কলেজের একটি ভগিনী প্রতিষ্ঠান হিসাবে কিং হেনরি ষষ্ঠ দ্বারা "কেঞ্জের কলেজ অফ আওয়ার লাডিয়ে অফ ইটন বেইসাইড উইন্ডসর" হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, এটি ১৮তম-প্রাচীনতম প্রধান শিক্ষক সম্মেলনে স্কুল হিসাবে তৈরি হয়েছিল। ইটনের ইতিহাস ও প্রভাব এটিকে বিশ্বের সর্বাধিক মর্যাদাপূর্ণ বিদ্যালয় হিসাবে পরিণত করেছে। — অনুবাদক
রাস্কিন বন্ড (জন্মঃ ১৯ মে ১৯৩৪)
রাস্কিন বন্ড (জন্মঃ ১৯ মে ১৯৩৪) হলেন একজন ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত
ভারতীয় লেখক। তিনি তার পরিবার নিয়ে ভারতের মুসৌরিতে থাকেন। "Our Trees Still Grow in Dehra" লেখার জন্য ১৯৯২ সালে তিনি সাহিত্য অ্যাকাডেমি
পুরস্কার পান। তিনি ১৯৯৯ সালে পদ্মশ্রী এবং ২০১৪ সালে পদ্মভূষণ পুরস্কারে ভূষিত হন। তার বই অবলম্বনে বলিউডে দুর্দান্ত সিনেমা
তৈরি হয়েছে।




Comments
Post a Comment