The Tragedy at Marsdon Manor [Crime]
মার্সডন ম্যানরের
ট্রাজেডি*
আগাথা ক্রিস্টি
অনুবাদ ও অলংকরণ ঃ দেবজ্যোতি বল্লভ
কিছুদিনের জন্য শহরের বাইরে গিয়েছিলাম, ফিরে এসে দেখি
পোয়ারো তার ছোট্ট হাতব্যাগখানা গোছাতে ব্যস্ত ।
“এ লা বন্ এ'র (ভাল সময়ে এসেছ), হেস্টিংস, ভয় হচ্ছিল
তুমি হয়ত আমায় সঙ্গ দিতে সময় মত আসতে পারবে না ।”
“তাহলে, আরেকখানা কেসের জন্য চলেছ, অ্যাঁ ?”
“হ্যাঁ, যদিও স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছি, ব্যাপারটা খুব
একটা আশাবাদী বলে মনে হচ্ছে না । নর্দান ইউনিয়ন কোম্পানি আমাকে মিঃ মালট্রাভার্স এর
মৃত্যু-তদন্তের ভার দিয়েছে । তিনি কিছু সপ্তাহ আগেই তাঁর জীবন বীমা করান । বিরাট অঙ্ক—প্রায়
পঞ্চাশ হাজার পাউন্ড ।”
“হ্যাঁ ?” কৌতুহলী হয়ে বললাম আমি।
“নিয়মাবলীতে অবশ্যই সাধারণ আত্মহত্যার ধারা আছে । বলা হয়েছে একবছরের মধ্যে তিনি আত্মহত্যা করলে প্রিমিয়াম বাজেয়াপ্ত হবে । মিঃ মালট্রাভার্সকে কোম্পানির নিজস্ব ডাক্তার যথাযত পরীক্ষা করেছেন এবং যৌবন উত্তীর্ণ হলেও, তাঁর স্বাস্থ্য মোটামুটি ভালোই ছিল । গত বুধবার — মানে গতকালের আগের দিন — মার্সডন ম্যানর এসেক্সে তাঁর বাড়ির বাগানে মিঃ মালট্রাভার্স এর লাশ পাওয়া যায় । মৃত্যুর কারণ বলা হয়েছে ইন্টারন্যাল হ্যামারেজ । এটা এমন কিছু নয় তবে মিঃ মালট্রাভার্সের আর্থিক অবস্থা নিয়ে সাংঘাতিক গুজব ছড়িয়েছে । নর্দান ইউনিয়ন ব্যাঙ্ক একপ্রকার নিশ্চিত যে ভদ্রলোক দেউলিয়া হতে বসেছিলেন । ফলে বিষয়টা ঘুরে যায় । মালট্রাভার্সের একটি সুন্দরী যুবতী স্ত্রী আছে — যাকে বলে 'বৃদ্ধস্য তরুনী ভার্যা' । মনে করা হচ্ছে স্ত্রীর সুবিধার্থেই তিনি তাঁর যথাসম্ভব টাকা বীমার লগ্নিতে ব্যায় করেন এবং অতঃপর আত্মহত্যা করেন । এরকমটা অস্বাভাবিক কিছু নয় । যাই হোক, আমার বন্ধু, নর্দান ইউনিয়ন ব্যাঙ্কের পরিচালক, অ্যালফ্রেড রাইট আমাকে বিষয়টার তদন্ত করতে বলেছে, কিন্তু ওই যা বললাম, এটার সাফল্য নিয়ে খুব একটা আশাবাদী আমি নই । যদি মৃত্যুর কারণ হার্টফেল হত তাহলে বেশি আসস্ত হতাম । স্থানীয় ডাক্তাররা অনেক সময়েই মৃত্যুর আসল কারণ ধরতে না পেরে হার্টফেল বলে চালিয়ে দেন কিন্তু ইন্টারন্যাল হ্যামারেজ মোটামুটি নিশ্চিত ভাবেই বলা যায় । তবুও আমরা কিছু প্রয়োজনীয় তদন্ত করতে পারি। হেস্টিংস, মিনিট পাঁচেক হাতে আছে, তোমার ব্যাগ গুছিয়ে নাও, তারপর লিভারপুল স্ট্রিট থেকে ট্যাক্সি ধরব ।”
ঘণ্টাখানেক বাদে আমরা একটা গ্রেট ইস্টার্ন ট্রেন থেকে
মার্সডন লেই’এর একটা ছোট্ট স্টেশনে নামলাম । স্টেশনে জিজ্ঞেস করে জানা গেল মার্সডন
ম্যানর মাইলখানেক দূরে । পোয়ারো হেঁটে যাওয়াই মনস্থির করল, অগত্যা আমরা মেন-রোডটাই বেছে নিলাম।
“তা আমাদের প্ল্যান অফ ক্যাম্পেন টা কি ?” জিজ্ঞেস করলাম
আমি।
“প্রথমে ডাক্তারের সাথে দেখা করব। আমি জেনেছি মার্সডন
লেইতে একজনই ডাক্তার আছেন— ডাক্তার র্যালফ বার্নার্ড । আহ! ওই যে তার বাড়ি ।”
বিশাল অট্টালিকাসম বাড়িখানা রাস্তা থেকে একটু ভিতরে
দাঁড়িয়ে আছে। গেটে তামার ফলকে খোদাই করা ডাক্তারের নাম । আমরা রাস্তাটুকু পেরিয়ে বেল
বাজালাম ।
ভাগ্য আমাদের সহায় । এটা ডাক্তারের কন্সাল্টিং আওয়ার
আর কোনো রোগীও তাঁর প্রতিক্ষায় নেই । ডা. বার্নার্ড প্রবীন; সুবিশাল কাঁধদুটি অস্পষ্ট
প্রসন্নতায় নত ।
পোয়ারো নিজের পরিচয় দিয়ে আমাদের আগমনের কারণ জানালো।
বীমা কোম্পানি এইসব ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ তদন্ত করে থাকে—তাও জানিয়ে দিল।
“নিশ্চই, নিশ্চই” অস্পষ্টভাবে বললেন ডা. বার্নার্ড
“তিনি যা ধনী ছিলেন, তাতে করে টাকার অঙ্কটা বেশ বড়ই হবে, তাই না?”
“আপনি তাকে ধনী বলে মনে করেন, ডাক্তার ?”
ডাক্তার বিস্মিত হলেন ।
“কেন তিনি নন? আপনি জানেন তার দুটো গাড়ি আছে, আর মার্সডন
ম্যানরও বেশ বড় জায়গা, যদিও আমার মনে হয় তিনি বেশ সস্তাতেই ওটা কিনেছিলেন ।”
“বুঝতে পারছি, পরে তার যথেষ্ট ক্ষতি হয়েছিল”, সরুভাবে
ডাক্তারকে নিরীক্ষন করতে করতে বলল পোয়ারো ।
বিষন্নভাবে মাথা নাড়লেন ডাক্তার ।
“তাই নাকি ? তবে তার স্ত্রীর পক্ষে জীবন-বীমাটা আছে
তাই রক্ষে । ভারী সুন্দর, প্রানবন্ত মেয়ে । এ বিপর্যয়ে কি দশাটাই না হয়েছে । মানসিক
চাপটা বড় বেশি । আমি আমার যথাসাধ্য করেছি, তবুও ধাক্কাটাও তো গুরুতর ।”
“ইদানিং আপনি মিঃ মালট্রাভার্স কে দেখছিলেন, তাই না?”
“না, মহাশয় আমি তাঁর চিকিৎসা করিনি ?”
“মানে?”
“আমার মনে হয় মিঃ মালট্রাভার্স খ্রিশ্চান বিজ্ঞানী ছিলেন—
বা ওই জাতীয় কিছু ।”
“কিন্তু আপনি তো তাঁর মৃতদেহ পরীক্ষা করেছিলেন ?”
“অবশ্যই । এক মালি এসে আমায় ডেকে নিয়ে যায় ।”
“আর মৃত্যুর কারন পরিস্কার ?”
“নিঃসন্দেহে । ঠোঁটে একটু রক্ত লেগে ছিল তবে বেশিরভাগ
রক্তক্ষরণ ভিতরেই হয়েছে ।”
“তাঁকে যেখানে পাওয়া যায় তিনি কি সেখানেই পড়ে ছিলেন
?”
“হ্যাঁ, কেউ তখনো মৃতদেহ ছোঁয়নি । তিনি ছোটো একটা ঝোপের
ধারে পড়েছিলেন । নিশ্চই কাক মারতে বেরিয়েছিলেন, একটা কাক-মারা বন্দুকও তার পাশে পড়েছিল
। হঠাৎ করেই রক্তক্ষরণ শুরু হয় । গ্যাস্ট্রিক আলসার, সন্দেহ নেই ।”
“গুলিবিদ্ধ হবার সম্ভাবনা নেই?”
“ বলেন কি মশাই !”
“মাফ করবেন,” বিনীতভাবে বলল পোয়ারো । “কিন্তু যতদূর
মনে পড়ছে সাম্প্রতিক একটা মার্ডার কেসে ডাক্তার প্রথমে হার্টফেল বলে রায় দিয়েছিল তবে
পরে একজন লোকাল কনস্টেবল মৃতের মাথায় গুলির ক্ষত দেখতে পায় !”
“আপনি মিঃ মালট্রাভার্সের দেহে কোনো গুলির ক্ষত পাবেন
না”, নীরসভাবে বললেন ডা. বার্নার্ড । “মহাশয়দের যদি আর কিছু জানার না থাকে —”
ইঙ্গিতটা পরিষ্কার ।
“আপনার সকালটা ভাল কাটুক, আমাদের প্রশ্নের উত্তর দেবার জন্য অনেক
ধন্যবাদ ডাক্তার, । বাই দ্য ওয়ে অটোপ্সির কোনো প্রয়োজন আছে কি ?”
“অবশ্যই না” আরক্তবদনে বললেন ডাক্তার । “মৃত্যুর কারণ
সুস্পষ্ট, আমার মনে হয় মৃতের আত্মীয়দের অযথা কষ্ট দিয়ে কোনও লাভ নেই ।”
অতঃপর তিনি ঘুরে সজোরে আমাদের মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে
দিলেন ।
“ডা. বার্নার্ডকে কেমন দেখলে, হেস্টিংস ?” ম্যানরের
দিকে যাওয়ার পথে জিজ্ঞেস করল পোয়ারো ।
“একটা বুড়ো গর্ধব ! ”
“ঠিক বলেছ । চরিত্র সম্পর্কে তোমার মতামত চিরকালই অসামান্য,
বন্ধু ।”
আমি বিরক্তভাবে তাকালাম, কিন্তু তাকে সম্পূর্ণ গম্ভীর
বলেই মনে হল । যাই হোক অতঃপর সে চোখ মিটমিট করে কটূক্তি করলে “তা কোনো সুন্দরী মহিলার
প্রশ্ন হলে আলাদা কথা !”
উৎসাহ-হীণভাবে তাকালাম আমি ।
ম্যানর হাউসে
পৌঁছোতে এক মাঝবয়সি পরিচারিকা এসে দরজা খুলে দিল । পোয়ারো তাকে তার কার্ড আর মিঃ মালট্রাভার্সের
বীমা কোম্পানির চিঠিখানা দিল ।
সে আমাদের
একটা ছোট ঘরে রেখে মালকিনকে ডাকতে চলে গেল । প্রায় দশমিনিট পরে দরজা খুলল এবং বিধবার
বেশে এক মূর্তি দোরগোড়ায় আবির্ভুত হল ।
“মঁসিয়ে
পোয়ারো ?” আমতা আমতা করে তিনি বললেন ।
“ম্যাডাম
!” পোয়ারো উঠে তার দিকে এগিয়ে গেল । “আপনার এই অসুবিধার জন্য আমি সত্যিই দুঃখিত । কিন্তু
কি করবেন ? এসব ব্যাপারে তাদের দয়া-মায়া বলে কিছু নেই ।”
মিসেস মালট্রাভার্স
চেয়ারে বসলেন । কান্নায় চোখ লাল হলেও তাতে
তার অপরূপ সৌন্দর্যের কোনো ক্ষতি হয়নি । তার বয়স কত হবে— সাতাশ কি আঠাশ , গৌরবর্ণ
, বড় বড় দুটো নীল চোখ আর সুন্দর বিস্ফুরিত ঠোঁট ।
“এটা আমার
স্বামীর বিমার ব্যাপারে, তাই না ? কিন্তু এত তাড়াতাড়ি এসব নিয়ে ভাবার কোনো দরকার আছে
কি ?”
“মনে সাহস
আনুন ম্যাডাম, সাহস ! দেখুন, আপনার স্বর্গত স্বামী বড় অঙ্কের বীমা করে গেছেন আর এসব
ক্ষেত্রে কোম্পানি কিছু খোঁজখবর নিয়েই থাকে । একাজে তারাই আমাকে বহাল করেছে । আপনি
নিশ্চিন্ত থাকুন, আমি যথাসম্ভব চেষ্টা করব যাতে ব্যাপারটা অপ্রীতিকর না হয় । আপনি কি
সংক্ষেপে বুধবারের ঘটনাগুলো বলবেন ?”
“আমি তখন
চায়ের জন্য তৈরি হচ্ছিলাম এমন সময় কাজের মেয়েটা উঠে এল —একজন মালি এইমাত্র দৌড়ে বাড়িতে
ঢুকল । সে বলল—”
তার গলা
বুজে এল। পোয়ারো সহানুভুতির সঙ্গে তার হাত ধরল ।
“আমি বুঝতে
পারছি ! আপনি কি আপনার স্বামীকে বিকেলের আগে দেখেছিলেন ?”
“লাঞ্চের
পর আর দেখিনি । আমি কিছু স্ট্যাম্পের জন্য বাইরে গিয়েছিলাম । আমার বিশ্বাস ও বাগানে
কিছু একটা করছিল ।”
“গুলি করে
কাক মারছিলেন, তাই তো ?”
“হ্যাঁ,
ও সাধারণত ওর ছোটো কাক-মারা বন্দুকটা সাথে করে নিয়ে যায় । আমি দুএকটা গুলির আওয়াজও
শুনেছি ।”
“এই ছোটো
কাক-মারা বন্দুকটা এখন কোথায়?”
“হলে আছে
মনে হয় ।”
তিনি ঘর
থেকে বেরিয়ে গেলেন এবং ছোট্ট অস্ত্রখানা খুঁজে এনে পোয়ারোকে দিলেন ।
পোয়ারো দ্রুত
সেটা দেখে নিল ।
“দুটো গুলি
ছোঁড়া হয়েছে, বুঝলাম,” বন্দুক ফেরত দিয়ে সে বলল “এবার ম্যাডাম যদি একটিবার দেখা যায়—”
এই বলে সে
থামল ।
“চাকররা
আপনাকে নিয়ে যাবে,” তিনি বিড়বিড় করে বললেন ।
পরিচারিকাটি
পোয়ারোকে উপরে ডেকে নিয়ে গেল । আর আমি এই সুন্দর হতভাগ্য মহিলার সঙ্গে রয়ে গেলাম ।
আমি বুঝতে পারছিলাম না কিছু বলব নাকি চুপচাপ থাকব । আমার দুএকটি সাধারণ কথায় তিনি অন্যমনস্কভাবে
উত্তর দিলেন । এর কয়েক মিনিট পরেই পোয়ারো এসে যোগ দিল ।
“আপনার অনুগ্রহের
জন্য অশেষ ধন্যবাদ, ম্যাডাম । আমার মনে হয় না এ ব্যাপারে আপনাকে আর কোনো ঝামেলা পোহাতে
হবে । বাই দ্য ওয়ে আপনার স্বামীর আর্থিক অবস্থা কেমন ছিল?”
তিনি মাথা
নাড়লেন।
“কিছুই জানি
না । ব্যবসা-পত্তরের ব্যাপারে আমি চিরকালই গবেট ।”
“বুঝলাম। তাহলে আপনি জানেন না তিনি হঠাৎ জীবন বিমা
করতে গেলেন কেন ? তিনি আগে কখনো করেননি, আচ্ছা ।”
“আসলে আমরা
এই বছরখানেক হল বিয়ে করেছি । তবে সে কেন জীবন বিমা করল তার কারণ বোধহয় ও একপ্রকার ভেবেই
নিয়েছিল আর বেশিদিন সে বাঁচবে না । নিজের মৃত্যুসম্পর্কে তার একটা গভীর আশঙ্কা ছিল
। আমি জানতাম এর আগেও তার একবার রক্তক্ষরণ হয়েছে, এবং সে জানত আরেকটা তার পক্ষে মারাত্মক
হতে পারে । আমি তার এই উদ্ভট ভয়গুলো দূর করার অনেক চেষ্টা করেছি, কিন্তু বৃথাই । হায়,
সেই ঠিক ছিল !”
তাঁর চোখ জলে ভরে উঠল । তিনি আমাদের সসম্ভ্রমে বিদায়
জানালেন । পোয়ারোও নিজস্ব ভঙ্গিতে বিদায় জানাল । অতঃপর আমরা গাড়ি বারান্দায় নেমে এলাম
।
“এই হল
! বন্ধু, এবার লন্ডনে ফেরার পালা । মনে হচ্ছে এই গর্তে কোনো ইঁদুর নেই । কিন্তু তবুও—”
“তবুও কি
?”
“একটা ছোট্ট
খটকা, এই আর কি ! তুমি লক্ষ্য করনি ? করনি তুমি ? যদিও জীবন বিচিত্রতায় ভরা তবুও, আমার
বিশ্বাস লোকটি এভাবে মারা যেতে পারে না—এমন কোনো বিষ পাওয়া যায়নি যার জন্য তার মুখে
রক্ত উঠবে । না , না আমকে নিশ্চই পদত্যাগ করতে হবে এবার, পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে—কিন্তু
কে ?”
একজন ঢ্যাঙা
যুবক গাড়ি বারান্দায় উঠে কোনো ইঙ্গিত না করেই আমাদের পাশ কাটিয়ে এগিয়ে গেল । লোকটা
সুশ্রী, মুখখাণা শীর্ণ, তামাটে যাতে নিরক্ষীয় জলবায়ুর প্রভাব সুস্পষ্ট । মালি পাতা
ঝাঁট দিতে দিতে একমিনিটের জন্য থামল । পোয়ারো তার কাছে দৌড়ে গেল ।
“আমার অনুরোধ,
বলো, ওই লোকটি কে ? তুমি ওকে চেন ?”
“আমি শুনেছিলাম
কিন্তু আমার নামটা মনে নেই, স্যার । গত হপ্তায় তিনি একটা রাত্তির এখানে কাটিয়েছিলেন
। হ্যাঁ, মঙ্গলবার ছিল ।”
“তাড়াতাড়ি,
মন্এ মি ( বন্ধু ) ওকে ফলো করো ।”
এগিয়ে চলা
মূর্তিটির পিছনে আমরা ধাওয়া করলাম । বাড়ির পাশের সিঁড়িতে কালো কাপড়ে ঢাকা অবয়বের একঝলক
দেখা গেল । তারপর দেখতে পেলাম আমাদের শিকার আর পিছনে আমরা — এ সাক্ষাতের সাক্ষী।
মিসেস মালট্রাভার্স স্তম্ভিত হয়ে সেখানেই দাঁড়িয়ে
রইলেন । তার মুখখানা ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে।
“তুমি”,
তিনি ফিসফিস করে বললেন । “আমি তো ভেবেছিলাম তুমি সমুদ্রে পাড়ি দিয়েছ —পূর্ব আফ্রিকা
?”
“আমার উকিলের
থেকে কিছু খবর পেয়ে আটকে গেছি”, যুবকটি বললেন। “আমাক কাকা, স্কটল্যান্ডে থাকতেন, হঠাৎ
মারা গেছেন আর কিছু টাকাও রেখে গেছেন । এই অবস্থায় আমি না যাওয়াই মনস্থির করলাম । তারপর
খবরের কাগজে এই দুঃসংবাদটা পেলাম তাই যদি কিছু করতে পারি এই ভেবে চলে এলাম । হয়ত তোমার
সবকিছু দেখাশোনার জন্য কাউকে প্রয়োজন হবে ।”
এই মুহুর্তে
তারা আমাদের উপস্থিতি টের পেল। পোয়ারো এগিয়ে গিয়ে মাফ চাইল — তার ছড়িটা ভুল করে হলে
ফেলে এসেছে । আমার মনে হল একপ্রকার অনিচ্ছুকভাবেই মিসেস মালট্রাভার্স পরস্পরের পরিচয়
করিয়ে দিলেন ।
“মঁসিয়ে
পোয়ারো, ক্যাপ্টেন ব্ল্যাক ।”
কয়েক মিনিটেই
আড্ডা শুরু হয়ে গেল। পোয়ারো জানতে পারল ক্যাপ্টেন ব্ল্যাক অ্যাঙ্কর সরাইখানায় উঠেছেন
। নিখোঁজ ছড়িটা পাওয়া যায়নি (যদিও তাতে অবাক হবার মতো কিছু নেই) । পোয়ারো আরো একদফা মাফ চেয়ে বেরিয়ে এল ।
আমরা দ্রুত
গ্রামে পৌঁছলাম । পোয়ারো অ্যাঙ্কর সরাইখানায় ব্যবস্থা করে নিল ।
“আমাদের
বন্ধু ক্যাপ্টেন ব্ল্যাক না আসা পর্যন্ত আমরা এখানেই থাকব,” সে বলল । “তুমি লক্ষ্য
করেছ আমি জোর দিয়ে বলেছিলাম যে ফার্স্ট ট্রেনেই আমরা লন্ডন ফিরে যাচ্ছি ? তুমি হয়ত
ভেবেছিলে সত্যিই তাই । কিন্তু না— তুমি খেয়াল করেছ মিসেস মালট্রাভার্স এর মুখটা — যখন
তিনি ক্যাপ্টেন ব্ল্যাককে দেখতে পান ? তিনি স্পষ্টতই হতচকিত হয়ে গিয়েছিলেন । আর ক্যাপ্টেন
ব্ল্যাক সত্যিই ওর প্রতি নিষ্ঠাবান—তাই না ?
তিনি কিন্তু মঙ্গলবার রাতে এখানে ছিলেন— মানে মিঃ মালট্রাভার্স মারা যাবার আগের
দিন ।ক্যাপ্টেন ব্ল্যাকের কার্যকলাপ সম্পর্কে আমাদের খোঁজখবর নেওয়া উচিত, হেস্টিংস
।”
আধঘণ্টা
বাদে আমাদের শিকার সরাইখানায় এসে হাজির হল । পোয়ারো তাকে আমাদের ঘরে নিয়ে এল ।
“আমি ক্যাপ্টেন
ব্ল্যাককে আমাদের এখানে আসার কারণটা বলছিলাম,” বলল পোয়ারো । “আপনি বুঝতেই পারছেন মঁসিয়ে
ক্যাপ্টেন যে মিঃ মালট্রাভার্স মৃত্যুর ঠিক আগের মানসিক অবস্থা নিয়ে আমি চিন্তিত এবং
সেইসঙ্গে আমি মিসেস মালট্রাভার্সকেও এইসকল পীড়াদায়ক প্রশ্ন করে বিরক্ত করতে চাই না
। এখন আপনি ঘটনার আগের দিন সেখানে উপস্থিত ছিলেন । তাই আপনার কথাও সমান মূল্যবান ।”
“আমি আপনাদের
সাহায্যের জন্য সবকিছু করতে প্রস্তুত,” বললেন তরুন সৈনিক; “কিন্তু আমার আশঙ্কা সাধারণের
বাইরে আমি কিছুই লক্ষ্য করিনি । দেখুন, মালট্রাভার্স আমার লোকদের পুরোনো বন্ধু হলেও
তার ব্যাপারে আমি বড় একটা কিছু জানি না ।”
“আপনি কখন
এসেছেন ?”
“মঙ্গলবার
বিকেলে । আমি বুধবার সকালে উঠেই শহরে চলে যাই কারণ আমার জাহাজ টিলবুরি থেকে দুটোর সময়
ছাড়বার কথা ছিল । কিন্তু কয়েকটা খবর পেয়ে মত বদল করি এবং আমার মনে হয় মিসেস মালট্রাভার্সকে
বলবার সময় সে কথা আপনারা শুনেছেন ।”
“আপনি পূর্ব
আফ্রিকা থেকে ফিরেছেন, তাই তো?”
“হ্যাঁ,
আমি যুদ্ধের সময় থেকে ওখানেই ছিলাম— মহান দেশ ।”
“ঠিকই। আচ্ছা
মঙ্গলবার রাতে ডিনারের সময় আপনাদের কি কথা হয়েছিল ?”
“ওহ, আমি
জানি না । সধারণ এটাওটা বিষয় । মালট্রাভার্স আমার লোকেদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছিলেন,
তারপর জার্মানির পুনরুত্থান নিয়ে আলোচনা হল আর তারপর মিঃ মালট্রাভার্স আমাকে পূর্ব
আফ্রিকা নিয়ে অনেক কিছু জিজ্ঞাসা করলেন এবং আমি তাকে কয়েকটা গপ্প শোনালাম, এই আর কি
।”
“ধন্যবাদ
।”
পোয়ারো কয়েকমুহুর্ত
চুপ করে বসে রইল তারপর ধীরেধীরে বললঃ “যদি অনুমতি দেন তাহলে আমি একটা ছোট্ট এক্সপেরিমেন্ট
করতে চাই । আপনার সচেতন মনে যা ছিল তা আপনি বলেছেন, এখন আমি আপনার অবচেতন মনকে কতকগুলি
প্রশ্ন করতে চাই ।”
“সাইকোঅ্যানালিসিস
নাকি ?” চম্কে জিজ্ঞেস করলেন ব্ল্যাক ।
“ওহ, না
না”, পোয়ারো আশ্বাস দিয়ে বলল।“এটা এরকম— আমি আপনাকে একটা শব্দ বলব এবং তার বদলে আপনি
একটা বলবেন, এইভাবে চলতে থাকবে । যেকোনো শব্দ যা প্রথমে আপনার মনে আসবে । তাহলে শুরু
করি ?”
“ঠিক আছে,”
ধীরে ধীরে বললেন ব্ল্যাক, কিন্তু তাকে অস্থির দেখাচ্ছিল ।
“হেস্টিংস,
শব্দগুলো নোট করে নাও প্লিজ”, বললে পোয়ারো। তারপর পকেট থেকে বড় ঘড়িখানা বের করে পাশের
টেবিলে রাখল । “আমরা শুরু করছি । দিন ।”
কয়েকমুহুর্তের
বিরতি অতঃপর ব্ল্যাক জবাব দিলেনঃ
“রাত্রি ।”
পোয়ারো যত
এগোতে থাকল ততই দ্রুত উত্তর আসতে লাগল ।
“নাম,” বলল
পোয়ারো ।
“স্থান ।”
“বার্নার্ড
।”
“শ ।”
“মঙ্গলবার
।”
“ডিনার ।”
“যাত্রা
।”
“জাহাজ ।”
“দেশ ।”
“উগান্ডা ।”
“গল্প ।”
“সিংহ ।”
“কাক-মারা
বন্দুক ।”
“খামার ।”
“গুলি ।”
“আত্মহত্যা ।”
“হাতি ।”
“করিদাঁত ।”
“বাঁদর ।”
“উকিল ।”
“ধন্যবাদ,
ক্যাপ্টেন ব্ল্যাক । আর আধঘণ্টা কি একঘণ্টা নিশ্চই আপনি কাটিয়ে যেতে পারবেন ?”
“অবশ্যই
।” উঠতে গিয়ে তরুণ সৈনিক কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকল তারপর কপাল মুছল ।
“এখন, হেস্টিংস,”
দরজা বন্ধ হতে হেসে বলল পোয়ারো ।“তুমি সবই
দেখতে পাচ্ছ, তাই না ?”
“আমি বুঝতে
পারছি না তুমি কি বলতে চাইছ ?”
“এই শব্দের
লিস্টটা তোমাকে কিছু বলছে না ?”
আমি খুঁটিয়ে
দেখলাম, কিন্তু মাথা নাড়তে বাধ্য হলাম ।
“আমি সাহায্য
করছি । প্রথমেই বলি, ব্ল্যাক সময়ের মধ্যে ভালই উত্তর দিয়েছেন, কোনো বিরতি ছাড়া, তাই
আমরা ধরে নিতে পারি তাঁর গোপন করার মতো কোনো তথ্য ছিল না । ‘দিন’ থেকে ‘রাত্রি’ এবং
‘জায়গা’ থেকে ‘নাম’ এগুলো মামুলি । আমি কাজ শুরু করি ‘বার্নার্ড’ দিয়ে যার অর্থ তিনি
স্থানীয় ডাক্তারকে চেনেন কিনা ।স্পষ্টতই তিনি চেনেন না । এরপর আমার ‘মঙ্গলবার’ বলায়
তিনি বললেন ‘ডিনার’ কিন্তু ‘যাত্রা’ এবং ‘দেশ’ এর ক্ষেত্রে উত্তর দিলেন ‘জাহাজ’ এবং ‘উগান্ডা ,’ যার থেকে পরিষ্কার
বোঝা যাচ্ছে তাঁর বিদেশ যাত্রাটা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, এখানে আসাটা নয় । ‘গল্প’ বলতে
তাঁর মনে পড়ল একটা ‘সিংহ’-এর গল্প যা তিনি ডিনারের সময় বলেছিলেন । তারপর বললাম ‘কাক-মারা
বন্দুক’ তাতে তিনি সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিতভাবে বললেন ‘খামার ।’ যখন আমি বললাম ‘গুলি’
তিনি তৎক্ষণাৎ উত্তর দিলেন ‘আত্মহত্যা ।’ যোগাযোগটা পরিষ্কার । একজন লোক তার কাক-মারা
বন্দুক দিয়ে একটা খামারের কোথাও আত্মহত্যা করেন । মনে রেখো, তাঁর মাথায় এখনো ডিনারের
গল্পই ঘুরছে, এবং আমার মনে হয় তুমিও একমত হবে যে আমি সত্যের থেকে বেশি দূরে নেই ।এখন
ক্যাপ্টেন ব্ল্যাক যে বিশেষ আত্মহত্যার গল্পটা মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ডিনারের সময় বলেছিলেন
সেটা যদি আরেকটিবার বলেন ।”
ব্ল্যাক
এসব ব্যাপারে বেশ সোজাসাপ্টা ।
“হ্যাঁ,
আমি একটা গল্প বলেছিলাম বটে, এখন মনে পড়ছে । চ্যাপ একটা খামারে নিজেকে গুলি করেছিল
। সে একটা কাক-মারা বন্দুক দিয়ে মুখের উপর তালুতে গুলি করে ফলে গুলিটা ব্রেনে রয়ে যায়
। ডাক্তাররা তো ভেবেই সারা— কোনো চিহ্ন নেই খালি ঠোঁটে একটু রক্ত ছাড়া । কিন্তু কিজন্য—”
“মিঃ মালট্রাভার্সের
সঙ্গে এটার কিসের সম্পর্ক, তাই তো ? বুঝেছি,
আপনি বোধহয় জানেন না তাঁর কাছে একটা কাক-মারা বন্দুক পড়ে ছিল ।”
“আপনি বলতে
চান আমার গল্পই তাকে—ওহ, ভয়ঙ্কর !”
“নিজেকে
কষ্ট দেবেন না— এটা অন্যভাবেও হতে পারত । ঠিক আছে আমাকে এখনি একবার লন্ডনে টেলিফোন
করতে হবে ।”
পোয়ারো ফোনে
অনেকক্ষন কথা বলল, তারপর চিন্তিত মুখে ফিরে এল ।
বিকেলে সে
একাই বেরিয়ে গেল । প্রায় সন্ধ্যে সাতটার সময় সে বলল, এটাকে আর ফেলে রাখা ঠিক নয়, মিসেস
মালট্রাভার্সের কাছে খবরটা ভাঙ্গা দরকার ।
আমার সমবেদনা
ইতিমধ্যে অকপটভাবেই তাঁর কাছে চলে গেছে । তাঁর স্বামী তারই ভবিষ্যত সুনিশ্চিত করতে
আত্মহত্যা করেছে একথা কপর্দকশূন্য অবস্থায় জানা একজন মহিলার পক্ষে কঠিন বোঝা । তবে
গোপনে একটি আশা রাখি যে তরুণ ব্ল্যাক হয়ত এই প্রাথমিক দুঃখের পর তাঁকে সান্তনা দিতে
পারবে । সে নিঃসন্দেহে তাকে পছন্দ করে ।
লেডির সাথে
আমাদের সাক্ষাত বড়ই বেদনাময় । তিনি প্রথমে পোয়ারোর কথা তীব্রভাবে অস্বীকার করলেন, কিন্তু
অবশেষে যখন মেনে নিলেন তখন কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন ।
মৃতদেহ পরীক্ষা
করে আমাদের আর সন্দেহের অবকাশ রইল না । পোয়ারোও বেচারি মহিলার জন্য দুঃখিত হল । কিন্তু
তাকে ইনস্যুরেন্স কোম্পানি নিয়োগ করেছে তারই বা কি করার আছে । যখন বেরোবার জন্য প্রস্তুত
হচ্ছি তখন সে মিসেস মালট্রাভার্সকে আস্তে আস্তে বললে “ম্যাডাম, আপনার এবং সকলের জানা
উচিত কেউই প্রকৃতপক্ষে মৃত নন !”
“আপনি কি
বলতে চাইছেন ?” চোখ বড়বড় করে বললেন তিনি ।
“আপনি কোনো
আধ্যাত্মিক সেশনে কোনোদিন অংশ নেননি ? আপনি জানেন, আপনি একজন মিডিয়াম ?”
“আমকেও তাই
বলা হয়েছে । কিন্তু আপনি আধ্যাত্মিকতায় বিশ্বাস করেন না, নিশ্চয় ?”
“ম্যাডাম,
আমি কিছু উদ্ভট জিনিস দেখেছি । আপনি জানেন কি, গ্রামের লোকেরা বলে এই বাড়িটা ভুতুড়ে
?”
তিনি মাথা
নাড়লেন আর ঠিক তখনি পরিচারিকা জানাল ডিনার তৈরি ।
“আপনারা
কিছু খেয়ে যাবেন তো ?”
আমরা রাজি
হয়ে গেলাম । এও বুঝলাম, আমাদের উপস্থিতি তাঁকে তার দুঃখ থেকে হয়ত সাময়িকভাবে রেহাই
দেবে ।
সবে সবে
স্যুপ খাওয়া শেষ করেছি, ঠিক তখনি দরজার বাইরে একটা চিৎকার শোনা গেল আর তার সঙ্গে প্লেট
ভাঙার শব্দ । আমরা লাফিয়ে উঠলাম । পরিচারিকাটি প্রায় হৃৎপিণ্ডটা হাতে করে দৌড়ে এল ।
“একটা লোক—প্যাসেজে
দাঁড়িয়ে ।”
পোয়ারো দৌড়ে
গেল, আবার তক্ষুনি ফিরে এল ।
“সেখানে
কেউ নেই ।”
“কেউ নেই,
স্যার ?” ক্ষীনভাবে বলল পরিচারিকা ।“ওহ, আমিতো চমকে গিয়েছিলাম ।”
“কিন্তু
কেন ?”
সে গলা নামিয়ে
প্রায় ফিসফিস করে বলল ।
“আমি ভেবেছিলাম—ওটা
কর্তাবাবু—এক্কেবারে তার মতো দেখতে ।”
আমি দেখলাম
মিসেস মালট্রাভার্স ভয় পাচ্ছেন । আমর মনও সেই পুরোনো কুসংস্কারে চলে গেছে— আত্মহত্যা
করে কেউ শান্তি পায় না । তিনিও হয়ত তাই ভাবছিলেন । একমিনিট পরেই তিনি চেঁচিয়ে পোয়ারোর
হাত ধরে ফেললেন ।
“আপনি শুনতে
পাচ্ছেন ? জানলায় তিনবার টোকা ? ও ঠিক এভাবেই টোকা দিত ।”
“আইভি-লতা”
আমি বললাম “শার্সির বাইরে আইভি-লতাগুলো ঠেকছে ।”
কিন্তু একটা
ভয় আমাদের সবাইকেই পেয়ে বসছে । পরিচারিকার অনিচ্ছা
সত্ত্বেও মিসেস মালট্রাভার্স খাবার পরে পোয়ারোকে একটু থেকে যাবার অনুরোধ করল । তিনি
স্পষ্টতই একা থাকতে ভয় পাচ্ছেন । আমরা ছোট ঘরটায় বসে ছিলাম । বাড়ির চারপাশে ভূতুড়ে
শব্দ তুলে হাওয়া বইছে । দুবার ঘরের দরজাটা হুড়কো ঠেলে আসতে আসতে খুলে গেল, আর প্রতিবারই
তিনি আতঙ্কে খাবি খেয়ে আমার হাতটা আঁকড়ে ধরলেন ।
“আহ, এই
দরজাটানা ।” শেষমেশ রেগে বলল পোয়ারো । সে উঠে গিয়ে আবার দরজা বন্ধ করল তারপর চাবি ঘুরিয়ে
দিল । “এই লক করে দিলাম !”
“না, করবেন
না,” তিনি আঁতকে বলে উঠলেন । “এবারো যদি খুলে যায়—”
আর তখনি
সেই অসম্ভবটাই ঘটল । তালা দেওয়া দরজা আসতে আসতে খুলে গেল । আমার জায়গা থেকে প্যাসেজটা
দেখতে পাচ্ছিলাম না কিন্তু তিনি ও পোয়ারো ওদিকেই মুখ ফিরিয়ে ছিলেন । তিনি একটা লম্বা
চিৎকার করে উঠলেন ।
“আমি ওকে
দেখলাম— ওই প্যাসেজে ?” তিনি চিৎকার করে বললেন ।
পোয়ারো তাঁর
হতবাক মুখের দিকে চেয়ে ঘাড় নাড়ল ।
“আমি দেখলাম—
আমার স্বামী— আপনিও নিশ্চই দেখেছেন ?”
“ম্যাডাম,
আমি কিছুই দেখিনি । আপনার শরীরটা ভাল নেই—মানসিক চাপ—”
“আমি একদম
ঠিক আছি, আমি—হে, ভগবান!”
হঠাৎ কোনো
কারণ ছাড়াই আলোগুলো নিভে গেল । অন্ধকার থেকে ভেসে এল তিনটে খটখট শব্দ । আমি শুনতে পাচ্ছি
মিসেস মালট্রাভার্স গোঁঙাচ্ছেন । তারপর— আমি দেখলাম!
যে লোকটাকে
ওপরে বিছানায় দেখেছি সে আমাদের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে । মুখে একটা ভুতুড়ে আলোর আভা
। তার ঠোঁটে রক্ত লেগে আর সে তার ডানহাত তুলে ইঙ্গিত করছে । হঠাৎ একটা উজ্জল আলো এসে
পোয়ারো আর আমার মুখ হয়ে মিসেস মালট্রাভার্সের ওপর পড়ল । আমি তার ফ্যাকাসে ভয়ার্ত মুখখানা
দেখলাম এবং আরো কিছু !
“হে ভগবান,
পোয়ারো !” আমি চেঁচিয়ে উঠলাম । “দেখো ওঁর ডানহাতটা । পুরো লাল !”
মিসেস মালট্রাভার্সের নিজের
এবার চোখ পড়ল এবং সঙ্গেসঙ্গে তিনি মেঝের একটা স্তুপে টলে পড়লেন ।
“রক্ত,”
হিস্টিরিয়াগ্রস্তের মত চিৎকার করে উঠলেন । “হ্যাঁ, রক্ত । আমি খুন করেছি । আমি করেছি
। ও আমাকে দেখাচ্ছিল আর আমি ট্রিগার টেনেছি । আমকে ওর থেকে বাঁচান—বাঁচান আমাকে ! সে
ফিরে এসেছে !”
তার কথা
গলাতেই আটকে গেল ।
“লাইটস্”
মৃদুভাবে বলল পোয়ারো ।
যেন ম্যাজিকের
মত আলো জ্বলে উঠল ।
“এটাই,”
সে ফের বলল । “তুমি শুনেছ, হেস্টিংস ? আর তুমি, এভারেট ? ওহ, বাই দ্য ওয়ে, ইনি মিঃ
এভারেট, থিয়েটারের একজন চমৎকার লোক । আমি ওনাকে বিকেলে ফোন করেছিলাম । ওঁর মেকাপটা
সত্যি ভাল, তাই না ? একেবারে মৃতের মত । আর বাকিটা উনি ফস্ফোরেসেন্স দিয়ে করেছেন ।
আমি এনার ডানহাত ধরব না, যদি তুমি একটু ধর, হেস্টিংস । লাল রং । তুমি দেখেছ আমি অন্ধকারে
ওনার হাত ধরেছিলাম । বাই দ্য ওয়ে আমাদের ট্রেনটা মিস করা উচিৎ হবে না । জানলার বাইরে
ইনস্পেক্টর জ্যাপ অপেক্ষা করছেন । বিচ্ছিরি রাত— তবে উনি জানলায় যখন তখন টোকা দিয়ে
ভালই সময় কাটিয়েছেন ।
“তুমি দেখলে,”
ঝড়, বৃষ্টির মধ্যে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সে ফের বলল, “একটা ছোট্ট খটকা ছিল । ডাক্তার
জানেন মৃত একজন খ্রিস্টান বিজ্ঞানী, এবং তাকে সে কথা কে বুঝিয়েছে না, মিসেস মালট্রাভার্স
। কিন্তু আমাদের তিনি বলেছেন যে তার স্বাস্থ্য নিয়ে গভীর আশঙ্কা ছিল । আবার, তিনি মিঃ
ব্ল্যাককে ফিরে আসতে দেখে চমকে গেলেন কেন ? এবং শেষে, স্বামী মারা গেলে স্ত্রী-র বিলাপ
করাটাই নিয়ম, ওই ভারাক্রান্ত চোখের পাতা দেখে আমি গলবার পাত্র নই ! তুমি কি তা খেয়াল করেছ
? না ? প্রতিবারেই যা হয়, তুমি কিছুই দেখনি !”
“আচ্ছা,
দেখ । প্রথমত দুটো সম্ভাবনা ছিল । ব্ল্যাকের গল্প কি মিঃ মালট্রাভার্সকে আত্মহত্যার
একটা অভিনব পদ্ধতি ইঙ্গিত করেছিল নাকি আরেক শ্রোতা, অর্থাৎ তার স্ত্রী খুন করার এক
অভিনব পন্থা পেয়েছিল ? আমি দ্বিতীয়টার দিকেই ঝুঁকি । কারণ এই পন্থায় নিজেকে গুলি করতে
হলে তাঁকে পা দিয়ে ট্রিগার টানতে হত — আমার যা মনে হয় । এখন মিঃ মালট্রাভার্সকে যদি
একটা বুট খোলা অবস্থায় পাওয়া যেত, আমরা অবশ্যই তা কারও না কারও কাছে শুনতে পেতাম । ওরকম একটা
অদ্ভুত জিনিস কেউ না কেউ মনে রাখত ।
“কিন্তু না, যেমনটা বললাম, আমি তাই বুঝতে
পারি কেসটা মার্ডার, আত্মহত্যা নয়, কিন্তু আমার থিওরির কোনো প্রমান খুঁজে পাইনি, তাই
আজ রাতের এই ছোট্ট কমেডির আয়োজন ।”
“আমি এখনো এই কেসের মাথামুন্ডু দেখতে পাচ্ছিনা,”
বললাম আমি ।
“চলো আমরা একেবারে প্রথম থেকে শুরু করি ।
এখানে একজন বুদ্ধিমান, চক্রান্তকারী মহিলা, যে তাঁর স্বামীর আর্থিক অবস্থা জানে, সে
বয়স্কা সহচরীর থেকে ক্লান্ত হয়ে স্রেফ টাকার লোভে বিয়ে করে এবং তাকে বিরাট অঙ্কের জীবন
বিমা করতে প্ররোচিত করে । অতঃপর কার্যসিদ্ধির পথ খুঁজতে থাকে । একটি আকস্মিক ঘটনা তাকে
তা দেয় — আমাদের তরুণ সৈনিকের অদ্ভুত গল্প । পরের দিন বিকেলে যখন মঁসিয়ে ক্যাপ্টেন
সমুদ্রে, যেমনটা সে ভেবেছিল, সে এবং তার স্বামী বাগানে পায়চারি করতে যায় । ‘কাল রাতের
গল্পটা কি অদ্ভুত না !’ সে বলে । ‘এইভাবে একটা লোক নিজেকে গুলি করতে কখনো পারে ? যদি
হয় আমকে দেখাও না ! বেচারা— সে তাকে দেখায় । সে তার রাইফেলের ডগাটা মুখে লাগায়। তখন
এ নিচু হয়ে বসে ট্রিগারে আঙুল রাখে, তার দিকে হেসে তাকায় । ‘এখন, স্যার,’ সে বলে,
‘যদি আমি ট্রিগারটা টেনে দিই ?’
“এবং তারপর —এবং
তারপর,হেস্টিংস—সে ট্রিগারে চাপ দেয়!”
আগাথা ক্রিস্টি
: (১৫ই সেপ্টেম্বর ১৮৯০ – ১২ই জানুয়ারি ১৯৭৬)
ডেম আগাথা ম্যারি ক্লারিসা ক্রিস্টি, লেডি মালোওয়ান, ডিবিই (১৫ই সেপ্টেম্বর ১৮৯০ – ১২ই জানুয়ারি ১৯৭৬) একজন ইংরেজ লেখিকা ছিলেন। তিনি ৬৬টি গোয়েন্দা উপন্যাস ও ১৪টি ছোটগল্প সংকলন-সহ মোট ৮০টি বই লেখেন। তার রচিত বইগুলোর মধ্যে গোয়েন্দা এরকুল পোয়ারো
(Hercule Poirot) ও মিস মার্পল-এর (Miss Marple) কাহিনিগুলো অন্যতম। তাকে রহস্য উপন্যাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও উদ্ভাবনী লেখকদের একজন হিসেবে গণ্য করা হয়। তার ডাকনাম "দ্য কুইন অফ ক্রাইম" (অপরাধ উপন্যাসের রাণী বা রহস্য সাম্রাজ্ঞী)। তিনি বিশ্বের দীর্ঘতম সময় ধরে মঞ্চস্থ নাটক দ্য মাউসট্র্যাপ রচনা করেছেন। নাটকটি ১৯৫২ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ওয়েস্ট এন্ড থিয়েটারে মঞ্চস্থ হয়েছে। এছাড়া তিনি ম্যারি ওয়েস্টম্যাকট ছদ্মনামে ছয়টি উপন্যাস রচনা করেছেন।
সাহিত্যে অবদানের জন্য ১৯৭১ সালে তাকে অর্ডার অব দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ারের ডেম কমান্ডার খেতাবে ভূষিত করা হয়। গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস এর তথ্যানুসারে অগাথা ক্রিস্টি বিশ্বের সর্বকালের সর্বাধিক বিক্রীত বইয়ের লেখক এবং যেকোন ধরনের সাহিত্যকর্মের সর্বাধিক বিক্রীত লেখক, যে ক্ষেত্রে উইলিয়াম শেকসপিয়ারই কেবল তার সমকক্ষ। তার রচিত বইয়ের প্রায় দুইশত কোটি কপি বিশ্বব্যাপী বিক্রি হয়েছে, যার চেয়ে কেবলমাত্র বাইবেলই অধিকসংখ্যক বিক্রি হয়েছে। ক্রিস্টির বই সর্বমোট ৫৬টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ইউনেস্কোর বিবৃতি অনুসারে তিনি একমাত্র লেখক যার রচনা সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ভাষায় অনূদিত হয়েছে, ওয়াল্ট ডিজনি কর্পোরেশনের সম্মিলিত কাজই কেবল এ রেকর্ড ছাড়িয়েছে।
* মূলগল্প “The Tragedy
at Marsdon Manor.” প্রথম প্রকাশ “স্কেচ্” পত্রিকায় এপ্রিল ১৮, ১৯২৩









Comments
Post a Comment