A Brief History of Time . Part-2 [Popular Science]

 সময়ের ইতিবৃত্ত

বিগব্যাং থেকে ব্ল্যাকহোল


স্টিফেন হকিং


সটীক অনুবাদঃ দেবজ্যোতি বল্লভ



অনুবাদকের নিবেদন

সময়ের ইতিবৃত্তের প্রারম্ভে আমার মনে হয়, যেসব মহান ব্যক্তিগনের স্কন্ধে আরোহণ করে হকিং নতুনভাবে জগৎ ও ব্রহ্মাণ্ডকে দেখার প্রয়াস পেয়েছিলেন সেই সকল মননশীল ব্যক্তির সংক্ষিপ্ত জীবনী আমাদের অবগত হওয়া একান্ত প্রয়োজন । এই চিন্তাবিদদের জীবনব্যাপী বিজ্ঞান সাধনাই সময়ের ইতিহাসকে মূর্তরূপ প্রদান করেছে । গণিতের সাংকেতিক ভাষায় লিপিবদ্ধ হয়েছে সেই ইতিহাস । কথায় আছে ‘শ্রেয়াংসি বহু বিঘ্নানি’— ভালো কাজে বাধা আসবেই । এঁদের জীবন অধ্যয়ন করলে আমরা দেখতে পাই কি অসম্ভব প্রতিবন্ধকতাময় সে জীবন— আর সেই কারণেই তা আজও মহান— চিরস্মরণীয়, আমাদের সমানভাবে তা অনুপ্রাণিত করে । স্টিফেন হকিং –এর কর্মধারা জানার পূর্বে পদার্থবিদ্যার জগতে যুগান্তকারী আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন যে তিনজন বিজ্ঞানী তাঁদের সংক্ষিপ্ত পরিচয় ও জীবনী লিপিবদ্ধ করা হল । গালিলিও এবং আইনস্টাইনের জীবনী পরম শ্রদ্ধাস্পদ বিজ্ঞানী আচার্য্য সত্যেন্দ্রনাথ বসুর লেখা দুটি প্রবন্ধ থেকে সংকলিত করা হল । আর বেশি কথায় কাজ নেই;  হকিং –এর রাজ্যে আপনাকে স্বাগত জানাই ।  

 

পরিচিতি


গালিলিও

 

১৫ ই ফেব্রুয়ারি ১৫৬৪ গালিলিও পিসা-তে জন্মেছিলেন । সব দেশের বিজ্ঞানীর কাছে এঁর নাম সুপরিচিত । তাঁর জন্মের চার-শ বৎসর পরে আজ সব দেশে সভাসমিতিতে তাঁর কথা ও জীবনীর আলোচনা হচ্ছে ।

তাঁর পরিবারের নাম ছিল গালিলাই । পিতা পুরাণ-সাহিত্যে কৃতবিদ্য ছিলেন, তাছাড়া সঙ্গীত তত্ত্বের উপর বইও লিখেছিলেন কয়েকখানি । প্রথমে ১৩ বৎসরের ছেলে গালিলিও গেলেন Vallam-brosa-র বেনেডিক্‌টন (Benedictine) সম্প্রদায়ের মঠে । দুই বৎসর ধরে সাহিত্য, ন্যায় ও ধর্মশাস্ত্র অধ্যয়ন করলেন । তবে শেষ অবধি মঠ ছাড়তে হল । বাপ বললেন ছেলের দৃষ্টিশক্তি ক্ষীন, বেশি পড়াশোনা ক্ষতিকর । অবশ্য হয়তো মনে মনে একটু ভয়ও ছিল—ছেলে যদি সন্ন্যাসী হয়ে যায়—সংসারের দিকে নজর দিতে কেউ থাকবে না তাঁর পরে । সচ্ছল অবস্থা আর নেই তাঁর । সংসারের হতশ্রীকে পুনরুদ্ধার করতে ছেলেকে চেষ্টা করতে হবে । আজ এখন গালিলিওর জীবনের সব কথা জানা দুষ্কর । তবে আমরা জানি, তিনি নিজে খুবই ভালবাসতেন সঙ্গীত ও চিত্রকলা । নিজের ইচ্ছা চালাতে পারলে হয়তো শেষ অবধি চিত্রকর হয়ে পড়তেন । তবে তা হল না । ১৫৮১ সালে সতেরো বৎসরে ঢুকলেন পিসা (Pisa) বিশ্ববিদ্যালয়ে ডাক্তারী পড়তে । অভিভাবক ভেবেছিলেন এতেই অর্থাগমের বিপুল সম্ভাবনা । সে সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্যেক ছাত্রকে দর্শন পড়তে হত ।  তখন অ্যারিষ্টটলীয় যুগ— সেই গ্রীক দার্শনিকের কথা সকলেই মাথা পেতে নেয় নির্বিচারে । সব জ্ঞান ও বিজ্ঞান সুরু হতো ওই মনোভাবকে ভিত্তি করে । গালিলিওর ঝোঁক কিন্তু অল্প বয়স থেকেই হাতে কলমে করে দেখতে —তাই তর্ক লাগতো অন্য ছাত্রদের সঙ্গে । কখনও কখনও শিক্ষকদের সঙ্গেও বেঁধে যেত বাক্‌যুদ্ধ । যুক্তিতর্কের প্রতি প্রবণতা তাঁর সারা জীবনে লক্ষ করবার মতো জিনিস — এই স্বভাবই শেষ জীবনে তাঁর অশেষ দুঃখের কারণ হলো । এই কাজ-পাগল কি করে বিশুদ্ধ গণিতের দিকে ঝুঁকল ? গল্প এই—পরিবারের এক বন্ধু ছিলেন গণিতশাস্ত্রে মহাপণ্ডিত । তিনি বিখ্যাত ছিলেন সে সময়ে—সকলে যেত তাঁর কাছে পড়তে । একদিন কোন কাজে গালিলিও এসেছেন তাঁর বাড়ীতে । তাস্‌কানীর (Tuscany) শাসকের পুত্র তখন সেই মহাপণ্ডিতের কাছে পড়ছে ।কাজেই গালিলিও অনেকক্ষন দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রইলেন, অনেকক্ষণ মনোযোগ দিয়ে শুনলেন সেই গণিতের ব্যাখ্যা । এই শুরু হল মনের প্রচণ্ড পরিবর্তন সেই থেকে ডাক্তারী পড়ায় আনন্দ পান না । গণিতের অধ্যয়ন বাসনাই প্রবল হয়ে উঠল, গালিলিওর ডাক্তারী পড়া হলো না ।বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাধি আর পেলেন না । পারিবারিক নানা কারণে গৃহস্থালী ফ্লোরেন্সে (Florence) উঠে এল । বাবার অর্থ সামর্থ্য নেই ছেলেকে বিদেশে রেখে পড়ান । কাজেই গালিলিও চলে এলেন ফ্লোরেন্সে । এখানে সেই সভাপণ্ডিতের কাছে পড়তে শুরু করলেন— গণিত ও পদার্থবিদ্যা । অদ্ভুত তাঁর অধ্যাবসায় । অল্প সময়ের মধ্যেই শিক্ষককে ফেলে গেলেন অনেক পেছনে । এই বিদ্যায় ও অনুসন্ধানে প্রতিষ্ঠা এল— নানা দেশে তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল । ২৪ বৎসর বয়সে তিনি এই নিয়ে মেতে আছেন, উদ্ভাবন করছেন নানারকমের যন্ত্র এবং নানারকমের পরীক্ষাও সুরু হয়েছে তাদের সাহায্যে । নবীন বিজ্ঞানীকে প্রথমে ভুগতে হয়েছিল অর্থকষ্টের জন্যে । ছেলে পড়িয়ে রোজগারের চেষ্টা ছিল, কিন্তু তাতে অল্পই আয় হত সে সময় । তবে ১৫৮৮ সালে দেখি , পিসা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিতের শিক্ষকতা করছেন । আয় মাত্র ৬০ Scudi । একজন হিসেব করে বলেছেন —বর্তমানের হিসাবে এটা ৯০০-১০০০ টাকা বাৎসরিক আয়ের সামিল হবে । এতে পরিবারের সব খরচ চালানো দুষ্কর । তখন এদেশের মত ইটালিতে একান্নবর্তী পরিবারের যুগ । বাপ আবার মারা গেলেন ১৫৯১ সালে । গালিলিও হলেন কর্তা । সকলের ভার বইতে হলো—মা, দুই বোন । ছোট ভাই মাইকেল অ্যাঞ্জেলো (Micheael-Angelo) ( ইনি বোধহয় গান-বাজনা নিয়েই সময় কাটাতেন)  বিদেশ চলে গেলেন এবং পোল্যাণ্ডে রাজদরবারে কলাবিদ্‌ হলেন ।বাড়িতে-ফ্লোরেন্সে রয়ে গেল তাঁর স্ত্রী ও সাতটি ছেলে-মেয়ে । গালিলিওকে তাঁদেরও দেখতে হত ।এই জন্য সারাজীবন দেখা যায় গালিলিও একদিকে যেমন মহানুভব, পরের কথা ভাবছেন— অপর দিকে চাইছেন, কি করে তাঁর প্রচুর অর্থাগম হয় । তার জন্য করতে চাইছেন ব্যবসা, নানা স্থানে উমেদারী করছেন — ছুটাছুটি করছেন ও কর্মস্থল পরিবর্তন করছেন । যদিও মন তাঁর ফ্লোরেন্সেকেই ভালোবেসেছিল । সেখানেই তিনি থাকতে চাইতেন সারাজীবন । ফ্লোরেন্সকে যে জানে, সেই বুঝবে তাঁর শিল্পী মন ওই মহিমময়ী নগরীর প্রতি কেন এত বেশি আকৃষ্ট ছিল ।

পিতার মৃত্যুর পর সংসারের অনটন বাড়লো । তখন ১৫৯২ সালে এলেন পাড়ুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে মাতৃভুমি তাস্‌কানি ছেড়ে । এখানেই শুরু হল তাঁর প্রকৃত বিজ্ঞানীর জীবন । তবে চাপও পড়লো খুব বেশী— বিদ্যালয়ের অধ্যাপনা তো আছেই, তাছাড়া দেশ রক্ষার নানা ব্যাপারে পরামর্শদাতা হয়ে উঠলেন । আবার ফ্লোরেন্সকেও ভুলতে পারলেন না । ফ্লোরেন্সে আসতেন প্রতি গ্রীষ্মের ছুটিতে । এখানকার Duke-এর ছেলে Cosmo তাঁর প্রিয় ছাত্র । তাঁর মা আবার বিশ্বাস করতেন ফলিত জ্যোতিষে— রাশিচক্র কেটে ভবিষ্যত গণনায় । তাঁর মন জুগিয়ে তাও করতেন গালিলিও সময় সময় । যদিও এতে নিজে বিশ্বাস করতেন কিনা বলা শক্ত । নিজে কোপারনিকাসের বিশ্ব বিন্যাসে গভীর বিশ্বাসী । অবশ্য তখনও সর্বত্র টলেমীর যুগ চলছে । ফলিত জ্যোতিষের রাশিচক্র গ্রহনক্ষত্র সবই অচল পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘুরছে— এই পরিবেশে গ্রহদের অবস্থান নিয়েই জ্যোতিষের বিচার ও গণনা টলেমীয় পন্থায় করতে হয় । এদিকে গালিলিও নতুন মতবাদ নিয়ে মেতে আছেন । বিশ্ববিদ্যালয়ে পাড়ুয়ায় বক্তৃতা দিচ্ছেন— কোপারনিকাসের মতবাদের পক্ষে । প্রচুর লোক শুনতে আসত এই সব মনোজ্ঞ বক্তৃতা । 

দেখতে দেখতে কেটে গেল ১৮ বৎসর একই বিশ্ববিদ্যালয়ে । Venice এর সরকার তাঁর উপর খুশি । ১৬০৪ সনে আরও ৬ বৎসরের মেয়াদ বাড়ালো শিক্ষকতার । এই সময় তাঁর বৈপ্লবিক মতবাদের বিপক্ষে কেউ আপত্তি জানালো না ।

১৬০৯ সালে ঘটলো এক নতুন ব্যাপার— হল্যান্ডে একজন কাঁচের লেন্স নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে হঠাৎ একটি নলের দু-পাশে রেখে দেখলেন, দূরের জিনিস এভাবে বড় দেখায়— মনে হয় কাছে এগিয়ে এসেছে । গালিলিওর কাছে এই খবর পৌঁছালো । তিনি নিজে প্ল্যান এঁকে আলোর রেখাপথের বিষয় বিচার করতে লাগলেন । শীঘ্রই এই সমস্যার সমাধান হল । তিনিও দূরবিন তৈরি করতে পারলেন— এটি আরও ভাল ও শক্তিশালী হলো । হল্যান্ডে লোকটি দেখেছিল— সব উল্টো দেখায় তাঁর দূরবিনে । গালিলিও করলেন যে যন্ত্র, তার সাহায্যে সব জিনিস যথারীতি অবস্থিত দেখায় উল্টোপাল্টা হয় না । Venice-এর নৌবাহিনী তখন ঘুরে বেড়ায়, নানা দেশ থেকে পণ্য সংগ্রহ করে এনে ইউরোপে নানা স্থানে বেচা-কেনা করে— বানিজ্যে বসতি লক্ষ্মী । রূপকথার স্বপ্নপুরীর মত তখন Venice শহরের সম্পদ । মধ্যে মধ্যে  এর নৌবহরকে শত্রু পক্ষের আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষা করতে হত । আগে থেকে শ্ত্রুকে দেখতে পেলে যুদ্ধের প্রস্তুতি যথাসময়ে করা সম্ভব । তাই কতৃপক্ষ ভাবলেন— এই দূরবীন সব জাহাজে বসাতে হবে । গালিলিওর ওপর ভার পড়লো— দূরবীন জোগান দেবার । গালিলিও রাজি  হলেন —বাড়ী হয়ে উঠল ফ্যাকটারী করুশালা ।সেখান থেকে প্রচুর দূরবীন বিক্রী হতে লাগলো । তৈরির সঙ্গে সঙ্গে যন্ত্রেরও নানা উন্নতি হল । নতুনগুলি হলো আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী ।এবার গালিলিও পেলেন হাতের মধ্যে বিশ্বসমীক্ষার এক প্রধান যন্ত্র । আকাশের দিকে ফিরিয়ে গালিলিও অনেক নতুন দৃশ্য দেখলেন । তাঁর আগে এসব মানুষের কল্পনার অতীত ছিল । চাঁদের পাহাড়, ছায়াপথের মধ্যে লক্ষ লক্ষ তারার সমাবেশ চোখে ধরা পড়ল, আবার এল নতুন নতুন উপগ্রহের খবর । আমাদের পৃথিবীকে প্রদক্ষিন করে একটি মাত্র চন্দ্রমা । গালিলিও দেখলেন বৃহস্পতি গ্রহের ৪টি উপগ্রহ ঘুরছে । তখনকার দিনে ধার্মিক পণ্ডিতেরা এসব বিশ্বাস করতে চাইলেন না । তাঁরা ভাবলেন— এইভাবে কোপারনিকাশের বিশ্ববিন্যাস স্বপক্ষে যুক্তি সংগ্রহ করে গালিলিও অন্যায় করছেন ।  দূরবীনের মধ্যে কোন যাদুর বলে বৃহস্পতির চাঁদের ছবি পড়েছে, যা চোখে দেখা যায় না— তা যন্ত্র প্রতিপন্ন হলে সেটা যন্ত্রেরই কারসাজী । ধার্মিকেরা মত পরিবর্তন করলেন না ও পাছে তাঁদের বিশ্বাস টলে যায়, এই ভয়ে দূরবীনের ভিতর দিয়ে দেখতেও চাইলেন না ।এতে গালিলিওর আমোদ লাগলো । একজন উচ্চপদস্থ ধর্মযাজক, যিনি দূরবীনের ব্যবহার করতে চান নি, কাজেই বৃহস্পতির উপগ্রহে অবিশ্বাসী ছিলেন, মারা গেলেন । সেই সময়ে গালিলিও রহস্য করে বললেন— হয়তো এবার যাবার সময় ‘চন্দ্রগুলি’ দেখতে পাবেন । গালিলিওর নাম তখন দেশে দেশে অভিনন্দিত হচ্ছে । Venice-এর রাজ সরকারের কাছ থেকে অর্থও পাচ্ছেন প্রচুর । তবে এতে কাজের মধ্যে বিজ্ঞানীর অবসর মেলে না । অথচ মাথার মধ্যে অনেক নতুন নতুন কথা ভেসে উঠছে —নানা বিষয়ে অনুসন্ধান করতে চান, কিন্তু সময় পান না একাগ্র মনে এইসব বিষয় ভাবতে । অথচ সংসারে তাঁর প্রচুর অর্থের প্রয়োজন । তাই ১৬০৯ সালে যখন  Tuscany-র বৃদ্ধ ডিউক মারা গেলেন ও তাঁর ছাত্র Cosmo সেই গদিতে বসলেন, তখন তিনি ভাবলেন হয়তো এঁর কাছে যেতে পারলে তিনি আকাঙ্খিত অবসর পাবেন নিজের কাজ করতে, অথচ অর্থেরও কোনো অভাব থাকবে না । তাই ভিতরে ভিতরে চেষ্টা করতে লাগলেন দরবার করতে ডিউকের কাছে । এই সময় ফ্লোরেন্সের এক বন্ধুকে লেখা চিঠির থেকে কয়েক লাইনের সারাংশ উদ্ধৃত হলোঃ

“এখান থেকে অন্য কোথাও গেলে যে বেশি অবসর পাবো নিজের কাজ করতে, তা মনে হয় না । কারণ বক্তৃতা দিয়েই পয়সা রোজগার করতে হবে সংসার চালাতে । পাড়ুয়া ছাড়া অন্য কোন শহরে গিয়ে অধ্যাপনা করতে ইচ্ছাও হয় না নানা কারণে । অথচ অবসর না পেলে কাজও এগোবে না ।

ভিনিসে গণতন্ত্র — যতই এরা উদার বা মহানুভব হোক, বাঁধা কর্তব্য করা ছাড়া এদের কাছে বৃত্তি আশা করা বৃথা । যতদিন পারি এই গণতন্ত্রে বক্তৃতা ও লেখাপড়া চালাতে হবে— যা এখনকার লোকেরা চায় । মাইনে পেলে আর অবসর মিলবে না; অর্থাৎ যে অবসর ও অর্থানুকুল্য আমি চাইছি, সে কোন এক স্বতন্ত্র রাজার কাছ থেকে পাওয়া সম্ভব ।”                                                                               

আবার অন্যত্র লিখছেন— “রোজ রোজ নানা উদ্ভাবন করা যাচ্ছে । অবসর ও সাহায্য পেলে অনেক বেশি পরীক্ষা ও আবিস্কার করতে পারব ।”

এক বৎসর ধরে এই ধরনের কথাবার্তা চালালেন রাজার বিশ্বস্ত মন্ত্রী ও কর্মচারীদের সঙ্গে । শেষে ১৬১০ সালে শরৎকালে Tuscany –এর নতুন Grand Duke নিজের পুরানো গুরুকে আশ্রয় দিলেন— ১০০০ scudi মাইনে প্রতি বৎসর । তাছাড়া রাজপণ্ডিত ও দার্শনিক হিসাবে স্বর্ণপদকে বিভূষিত হলেন তিনি ।পাড়ুয়া ছেড়ে ফ্লোরেন্সে গেলেন গালিলিও ।

এবার বিজ্ঞান সেবার প্রচুর অবসর মিললো । তবে যে সব নতুন কথা বললেন, বিশেষ করে জ্যোতিষের বিষয়, তাতে ইউরোপের পণ্ডিতমহলে হৈ চৈ বেধে গেল । অনেকে তাঁর বিরুদ্ধতা করতে লাগলেন । তাছাড়া আর এক কারণে তাঁর সব আবিষ্কার ও মতামত শুধু পণ্ডিতমহলে আবদ্ধ রইল না । শিক্ষিত জনসাধারণের কাছে প্রচারের জন্য গালিলিও ধরলেন নতুন এক পন্থা । পণ্ডিতীমহলে চালু Latin ছেড়ে লিখতে আরম্ভ করলেন— নিজের আবিষ্কার ও মতবাদ, ইতালিয়ান ভাষায় । ইটালীর মধ্যে যাদের অক্ষর পরিচয় হয়েছে, এমন সব লোকই যাতে পড়তে পারে । ১৬১২ সালের মে মাসে তিনি চিঠিতে লিখলেনঃ

“আমি দেখি যুবকেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাচ্ছে— হচ্ছে ডাক্তার, দার্শনিক বা অন্য কিছু— যাহোক একটি উপাধি হলেই হল । তারপর এমন কাজে তারা নামে, যার জন্যে তারা একেবারেই অপটু । এদিকে যারা সত্য-সত্যই উপযুক্ত লোক, তারা কাজের মধ্য থেকে কিংবা দৈনিক দুশ্চিন্তার মধ্যে আর জ্ঞানের চর্চা করতে পারেন না । তাই সারাজীবন তাঁদের মনে এই ধারনা বদ্ধমূল থেকে যায় যে প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড বই এমন স্ব মহামূল্য জ্ঞানের ভাণ্ডার, যা তাদের কাছে একেবারে অবরুদ্ধ হয়ে থাকবে । কিন্তু আমি চাই তাঁদের মধ্যে এই সত্য জ্ঞানের উদ্বোধন করতে যে, বিশ্বপ্রকৃতি স্ক্ল মানুষকে চোখ দিয়েছেন তাঁর ক্রিয়াকলাপ দেখতে ও বুদ্ধি দিয়েছেন যাতে তার মর্মকথা সকলে বুঝতে পারে ও নিজেদের কাজে লাগাতে পারে ।”

নিজের দূরবিন নিয়ে গালিলিও অনেক নতুন আবিস্কার করলেন । চাঁদের পর্বতমালা, বৃহস্পতির উপগ্রহসমূহ, সূর্যবিম্বে কলঙ্কবিন্দু, শুক্র গ্রহের চন্দ্রের মত ঔজ্জল্যের হ্রাসবৃদ্ধি, শনির বলয় ইত্যাদি আরও অনেক জিনিস । এই ভাবে নিজের চোখে গ্রহমণ্ডলের অনেক বৈশিষ্ট্য দেখতে পেলেন, যার সত্যতা যে কেউ দূরবীনের সাহায্যে নিরূপণ করতে পারবে । কোপারনিকাসের মতবাদ তাঁর কাছে অভ্রান্ত মনে হল ।

যুক্তিবাদী গালিলিও ভাবলেন, এই সব কথা প্রকাশ করলে সকলকেই তাঁর স্বপক্ষে আনতে পারবেন । তাই সে বিষয়ে বইও লিখলেন তিনি । তা সত্ত্বেও সনাতনীরা কিন্তু তার বিরূদ্ধতা করতে লাগলেন । একদিকে ফ্লোরেন্সের ডোমিনিকান সম্প্রদায়ের সন্ন্যাসীরা, অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা অধ্যাপক ও ছাত্রেরা, যাঁরা এই সব নতুন মত মানতে পারতেন না কিংবা যাঁরা এই সব নতুন মত মানতে পারতেন না কিংবা যাঁরা তাঁর যশোপ্রতিভায় ঈর্শান্বিত হয়ে উঠলেন । প্রথম প্রথম গালিলিও তাঁর সহকর্মীদের মনোভাব নিয়ে অনেক ঠাট্টা-তামাসা করতেন, এতে তাদের বিদ্বেষ আরও বাড়লো । ধর্মযাজকেরা প্রচার করতে লাগলেন যে, গালিলিওর অধ্যাপনা ধর্মবিশ্বাসের পরিপন্থী, বাইবেলের অনেক কথার সরাসরি বিরুদ্ধে । তাঁরা গোপনে অভিযোগ করলেন — গালিলিও ধর্ম-বিদ্বেষ প্রচার করছেন; বাইবেলের উপর মানুষের বিশ্বাস নষ্ট করতে চাইছেন ।

তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র গোপনে কাজ আরম্ভ করলো । প্রথমে Inquisition রায় দিলেন যে, সূর্য যে জগতের কেন্দ্র স্বরূপ— এটি অযৌক্তিক এবং যথার্থ না, যা এতকাল ধার্মিক যাজক ও পণ্ডিতেরা শিক্ষা দিয়ে এসেছেন । সঙ্গে সঙ্গে  এই সিদ্ধান্তও প্রকাশ করলেন— পৃথিবীর আহ্নিক বা বার্ষিক গতির ধারণা প্রকৃত ধর্মবিশ্বাসের বিরোধী । ১৯১৬ সালে মার্চ মাসে কোপারনিকাসের বই ও তৎসম্পর্কিত আরও দুইটি বইয়ের প্রচার তাঁরা নিষিদ্ধ করে দিলেন এবং পুণ্যাত্মা পোপের কাছে এই খবর পৌছেঁ দিলেন ।

পোপ আদেশ দিলেন কার্ডিনাল বেলারিমিন যেন গালিলিওকে ডেকে বুঝিয়ে বলেন— তিনি যেন এই ভ্রান্তবিশ্বাস ত্যাগ করেন, আর তা যদি তিনি না করতে চান তো বিধিমত তাঁকে আদেশ দেওয়া হবে, যাতে তিনি এই মত প্রচার বা আলোচনা বন্ধ করেন । যদি তাতে তিনি অস্বীকৃত হন তো তাকে কারারূদ্ধ করা হবে । ১৬১৬ সালে গালিলিওর রোমে ডাক পড়লো । বেলারিমিন ছিলেন গালিলিওর হিতাকাঙ্ক্ষী ও সুহৃদ । জ্যোতিষ শাস্ত্র ছাড়াও অন্যান্য আবিষ্কারের গালিলিও তখন নাম করেছেন । জলে ভাসমান বস্তুর স্থিতিসাম্যের বিষয়ে ভাবছেন । আবার গতিবিজ্ঞানে অনেক নতুন কথাও তিনি বলতে আরম্ভ করেছেন, সেই সময় থেকেই । তাই কার্ডিনাল বেলারিমিন ডেকে আনলেন গালিলিওকে নিজের প্রাসাদে । বুঝিয়ে বললেন— কোপারনিকাসের তত্ত্ব নিয়ে তিনি যেন ধর্মপ্রচারকদের সঙ্গে তর্ক না করেন । গালিলিও রাজি হলেন, তবে তিনি ভাবলেন এখনো গণিতের কল্পনা হিসাবে হয়ত কোপারনিকাসের কথা আলোচনা করা যাবে কিংবা যুক্তিতর্ক দিয়ে টলেমী ও কোপারনিকাসের বিশ্ববিন্যাসের গুণাগুণ আলোচনা চলতে পারবে । তাই তার পরও তিনি যেমন অন্যান্য বিজ্ঞানের বই লিখলেন, গতির কথা বা ভাসমান বস্তুর স্থিতিরহস্য— সঙ্গে সঙ্গে কথোপকথনের আকারে দুই মতবাদের আলোচনা করে বই লিখে ছাপাবার অনুমতি চাইলেন । কিন্তু ইতিমধ্যে অনেক কিছু ঘটে গিয়েছে । পোপ ও বেলারিমিন মারা গিয়েছেন । নতুন আরেকজন পোপের পদে অধিষ্ঠিত । একসময়ে গালিলিও ভাবতেন— ইনি বিজ্ঞানকে শ্রদ্ধা করেন, তাই ভেবেছিলেন নতুন বই প্রকাশে অনুমতি মিলবে । কিন্তু হল হিতে বিপরীত, নানা কারণে তিনি নতুন পোপের বিরাগভাজন হয়েছেন । তাঁর বিষয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে । শেষে গালিলিওর ডাক পড়ল— ১২ ই এপ্রিল তিনি কারারুদ্ধ হলেন । বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করা নিষিদ্ধ হয়ে গেল । ৩০ শে এপ্রিল গালিলিওকে স্বীকার করানো হল যে, যা কিছু তিনি এই বিষয়ে কথোপকথনের ছলে লিখেছেন— সে সবই তাঁর বৃথা গর্বের অজ্ঞতা ও অসতর্কতার নিদর্শন । তাঁর নির্যাতনের এইখানেই শেষ হলো না । তাঁর মুখ দিয়ে বলানো হল যে, তিনি কোপারনিকাসের মতের বিশ্বাস ত্যাগ করেছেন । বিচারকদের সামনে অনুতাপব্যঞ্জক সাদা পোশাক পড়ে তিনি হাঁটু গেড়ে রইলেন । বিচারকেরা বললেন— “ তোমার ভুল দেশের ভয়ানক অমঙ্গল করেছে । তার শাস্তি তোমায় পেতে হবে, তোমার বই নিশিদ্ধ বলে ঘোষিত হবে । আমাদের আদেশে তোমাকে কারারুদ্ধ থাকতে হবে যতদিন আমরা তোমাকে রাখতে চাই, তাছাড়া তিন বৎসর ধরে প্রতি সপ্তাহে তোমাকে অনুতাপসূচক প্রার্থনা করতে হবে ।”

এর দু’দিন বাদে Inquisition তাঁকে ফ্লোরেন্সের দূতাবাসে প্রেরণ করলেন । প্রথমে তাকে সিয়ানাতে (Siana) তে Archbishop-এর নজরবন্দি করে রাখা হল । তারপর ফ্লোরেন্সের শহরতলীতে নিজের গৃহে অন্তরীন রইলেন ।

দুঃখে-কষ্টে গালিলিওর জীবনের শেষ ৯ বৎসর কাটলো । তখনো বিজ্ঞানের নতুন কথা ভাবতে চেষ্টা করতেন বটে, কিন্তু জীবন বিস্বাদ হয়ে গেছে । যে মেয়ে তাঁর পরিচর্যা করতো এই দুঃখকষ্টের মধ্যে সেও মারা গেল । নিজে অন্ধ হয়ে যেতে বসলেন । শেষের পাঁচ বৎসর একটু বন্ধন ঢিলে হল— কিছুটা বাধা নিষেধের হাত থেকে অব্যাহতি পেলেন পোপের করুণায়— নান দেশ থেকে তাঁকে দেখতে আসত, তাঁর বইও লেখা অবৈধ ভাবে অন্য দেশে চালান ও ছাপা হয়েছে ।ক্ষ্যাতি ও সহানুভূতি ছিল সেই খৃস্টীয় মহলে, যাঁরা রোমান ক্যাথলিক ধর্মপন্থী ছিলেন না । সর্বশেষে ৮ ই জানুয়ারি ১৬৪২ সালে ৭৭ বৎসর বয়সে তিনি দেহত্যাগ করলেন ।

প্রবাদ আছে যে, Inquisition বিচারকদের সামনে হাঁটু-গাড়া থেকে যখন তিনি দাঁড়িয়ে উঠলেন— তখন নাকি তিনি বলেছিলেন— “এ সত্বেও পৃথিবী চলমান ।” কিন্তু এটা হয়ত গল্প কথা । সনাতনী ধার্মিকেরা বিজ্ঞানের শ্বাসরুদ্ধ করবার চেষ্টা করেছিলেন যথারীতি । ফলে ইতালী দেশই পিছিয়ে পড়ল । ফ্রান্স, ইংল্যান্ড ও অন্যান্য দেশে গালিলিওর আজন্ম সাধনা সুফল প্রসব করল ।

গালিলিও প্রথমে সনাতনী ভ্রান্ত মতবাদের বিরুদ্ধে বিজ্ঞানের পরীক্ষিত সত্য প্রচার করতে চেষ্টা করেছিলেন । বলেছিলেন নিজে পরীক্ষা, বিচার ও যাচাই করা নিতে হবে সব সত্যক— শুধু আপ্তবাক্যকে বিশ্বাস করে জীবনকে গড়ে তুললে ভুল হবে । ফলে তিনি কুসংস্কার ও ধর্মান্ধতার যাঁতায় গুঁড়ো হয়ে গেলেন । তবে মানুষের অগ্রগতি স্তব্ধ রইল না ।

চারশত বৎসর বাদেও তাঁর প্রতি নানা লোকের ভক্তির অর্ঘ, সেই সত্যের জয় ঘোষনা করছে । “সত্যমেব জয়তে”    

— জ্ঞান ও বিজ্ঞান, এপ্রিল, ১৯৬৪

 

 

স্যার আইজ্যাক নিউটন

 

Sir Isaac Newton  (৪ জানুয়ারি ১৬৪৩ - ৩১ মার্চ ১৭২৭) প্রখ্যাত ইংরেজ পদার্থবিজ্ঞানী, গণিতবিদ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী, প্রাকৃতিক দার্শনিক এবং আলকেমিস্ট। অনেকের মতে, নিউটন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সবচেয়ে প্রভাবশালী বিজ্ঞানী। ১৬৮৭ খ্রিস্টাব্দে তার বিশ্ব নন্দিত গ্রন্থ 'ফিলসফিয়া ন্যাচারালিস প্রিন্সিপিয়া ম্যাথামেটিকা' প্রকাশিত হয় যাতে তিনি সর্বজনীন মহাকর্ষ এবং গতির তিনটি সূত্র বিধৃত করেছিলেন। এই সূত্র ও মূলনীতিগুলোই চিরায়ত বলবিজ্ঞানের ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে, আর তার গবেষণার ফলে উদ্ভূত এই চিরায়ত বলবিজ্ঞান পরবর্তী তিন শতক জুড়ে বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারার জগতে একক আধিপত্য বিস্তার করেছে । তিনিই প্রথম দেখিয়েছিলেন, পৃথিবী এবং মহাবিশ্বের সকল বস্তু একই প্রাকৃতিক নিয়মের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে । কেপলারের গ্রহীয় গতিসূত্রের সাথে নিজের মহাকর্ষ তত্ত্বের সমন্বয় ঘটিয়ে তিনি এর সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে সমর্থ হয়েছিলেন। তার গবেষণার ফলেই সৌরকেন্দ্রিক বিশ্বের ধারণার পেছনে সামান্যতম সন্দেহও দূরীভূত হয় এবং বৈজ্ঞানিক বিপ্লব ত্বরান্বিত হয় ।

বলবিজ্ঞানের ভিত্তিভূমি রচনা করেছেন নিউটন । রৈখিক এবং কৌণিক ভরবেগের সংরক্ষণ সূত্রের মাধ্যমে তিনি এই ভিত্তি রচনা করেন । আলোকবিজ্ঞানের কথায় আসলে তার হাতে তৈরি প্রতিফলন দূরবীক্ষণ যন্ত্রের কথা এসে যায় । একই সাথে তিনি আলোর বর্ণের উপর একটি তত্ত্ব দাঁড় করান যা একটি পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তিনি নিশ্চিত হয়েছিলেন । পর্যবেক্ষণটি ছিল ত্রিভুজাকার প্রিজমের মধ্য দিয়ে যাওয়া আলোর বিক্ষেপণের উপর, যার মাধ্যমে দৃশ্যমান বর্ণালির সৃষ্টি হয়েছিল । শব্দের দ্রুতি এবং শীতলীকরণ প্রক্রিয়া বিষয়েও তিনি গবেষণা পরিচালনা করেন যা থেকে নিউটনের শীতলীকরণ সূত্র এসেছে।

গণিতের জগতেও নিউটনের জুড়ি মেলা ভার। নিউটন এবং গট‌ফ্রিড লিব‌নিৎস (Leibnitz) যৌথভাবে ক্যালকুলাস নামে গণিতের একটি নতুন শাখার পত্তন ঘটান । এই নতুন শাখাটিই আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের জগতে বিপ্লব সাধনে মুখ্য ভূমিকা রেখেছে । এছাড়া নিউটন সাধারণীকৃত দ্বিপদী উপপাদ্য প্রদর্শন করেন, একটি ফাংশনের শূন্যগুলোর আপাতকরণের জন্য তথাকথিত নিউটনের পদ্ধতি আবিষ্কার করেন এবং পাওয়ার সিরিজের অধ্যয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখেন ।

২০০৫ খ্রিস্টাব্দে রয়েল সোসাইটি বিজ্ঞানের ইতিহাসে কার প্রভাব সবচেয়ে বেশি এ প্রশ্ন নিয়ে একটি ভোটাভুটির আয়োজন করে । ভোটের ফলাফলে দেখা যায়, এক্ষেত্রে নিউটন আইনস্টাইনের চেয়েও অধিক প্রভাবশালী ।

 

·       প্রাথমিক জীবন

আইজাক নিউটন আধুনিক বর্ষপঞ্জি অনুসারে ১৬৪৩ খ্রিস্টাব্দের ৪ঠা জানুয়ারিতে জন্মগ্রহণ করেন। তার জন্মস্থান লিংকনশায়ারের উল্‌সথর্প ম্যানরে। ম্যানর অঞ্চলটি উল্‌সথর্প-বাই-কোল্‌স্টারওয়ার্থের মধ্যে অবস্থিত। নিউটনের যখন জন্ম হয় তখনও ইংল্যান্ডে সমসাময়িক কালের আধুনিকতম প্যাপাল বর্ষপঞ্জির ব্যবহার শুরু হয়নি। তাই তার জন্মের তারিখ নিবন্ধন করা হয়েছিল ১৬৪২ সনের ক্রিস্‌মাস দিবস হিসেবে। তিনি তাঁর পিতা আইজাকের মৃত্যুর তিন মাস পর জন্ম নেন। তার বাবা গ্রামের একজন সাধারণ কৃষক ছিলেন । জন্মের সময় নিউটনের আকার-আকৃতি ছিল খুবই ছোট । তার মা হানাহ্‌ এইসকফ্‌ প্রায়ই বলতেন ছোট্টবেলার সেই নিউটনকে অনায়াসে একটি কোয়ার্ট মগের ভিতর ঢুকিয়ে দেওয়া যেত। তিন বছর বয়সে তাঁর মা আরেকটি বিয়ে করেন এবং নতুন স্বামী রেভারেন্ড বার্নাবাউস স্মিথের সাথে বসবাস করতে থাকেন । এসময় নিউটন তার মায়ের সাথে ছিলেন না । দিদিমা মার্জারি এইসকফের তত্ত্বাবধানে তার দিন কাটতে থাকে । নিউটন তাঁর সৎ বাবাকে পছন্দ করতে পারেন নি । তাঁর মা এই লোককে বিয়ে করেছে বলে মায়ের প্রতি তার কিছুটা ক্ষোভও ছিল । নিউটন তার ১৯ বছর বয়স পর্যন্ত করা পাপ কাজগুলোর একটি তালিকা প্রকাশ করেছিলেন । সেই তালিকা থেকে মায়ের প্রতি তার এই ক্ষোভের প্রমাণ পাওয়া যায় । তালিকায় লেখা ছিল : “আমার বাবা ও মা-কে এই বলে ভয় দেখাতাম যে, আমি তাদের থাকবার ঘর জ্বালিয়ে দেবো ।” নিউটনের মায়ের দ্বিতীয় বিবাহের ফলে তিন সন্তান জন্ম নেয় ।

নিউটনের প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন হয় বাড়ির পাশের এক ক্ষুদ্রায়তন স্কুলে । ১২ বছর বয়সে তাকে গ্রান্থামের ব্যাকরণ স্কুলে পড়াশোনার জন্য পাঠানো হয় । সেখানে তিনি এক ঔষধ প্রস্তুতকারক ও বিক্রেতার বাড়িতে থাকতেন। এই স্কুলে নিউটন ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী যা থেকে তার মেধার পরিচয় পাওয়া যায় । প্রথমদিকে তাঁর সাথে কেউ না পারলেও এক সময় আরেকটি ছেলে তাঁর সাথে ভালো প্রতিযোগিতা করতে সমর্থ হয়েছিল । স্কুল জীবনের প্রথম থেকেই নিউটনের সবচেয়ে বেশি ঝোঁক ছিল বিভিন্ন ধরনের যন্ত্র তৈরির প্রতি । সেই বয়সেই তিনি বায়ুকল, জল-ঘড়ি, ঘুঁড়ি এবং সান-ডায়াল তৈরি করেছিলেন । এছাড়া তার গুরুত্বপূর্ণ নির্মাণ ছিল একটি চার-চাকার বাহন যা আরোহী নিজেই টেনে চালাতে পারতেন । ১৬৫৬ খ্রিস্টাব্দে নিউটনের সৎ বাবা মারা যান । এরপর তাঁর মা উল্‌সথর্পে ফিরে এসে তাকে স্কুল থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে আসেন । উদ্দেশ্য ছিল বাড়িতে ক্ষেত-খামারের কাজ শিখিয়ে ভবিষ্যতের বন্দোবস্ত করে দেওয়া । কিন্তু সত্ত্বরই তিনি বুঝতে পারেন যে, খামারের কাজের দিকে নিউটনের কোনো ঝোঁক নেই । নিউটনের কাকা ছিলেন বার্টন কগলিসের রেক্টর । এই কাকার উপদেশ শুনেই পরিবার থেকে তাকে কেমব্রিজের ট্রিনিটি কলেজে পড়াশোনার জন্য পাঠানো হয়।


·       ট্রিনিটি কলেজে নিউটন

নিউটন ট্রিনিটি কলেজ থেকে ১৬৬১ খ্রিস্টাব্দে মেট্রিকুলেশন পাশ করেন । কলেজে অধ্যয়নকালে তিনি তার পড়াশোনার খরচ চালানোর জন্য কলেজের বিভিন্ন স্থানে ভৃত্যের কাজ করতেন । ছাত্র হিসেবে বড় কোন কিছু তিনি করেছেন বলে ট্রিনিটি কলেজের কোন দলিলপত্র লেখা নেই । তবে জানা যায় তিনি মূলত গণিত ও বলবিজ্ঞান বিষয়ে অধিক পড়াশোনা করেছিলেন । ট্রিনিটি কলেজে প্রথমে তিনি কেপলারের আলোকবিজ্ঞান বিষয়ক সূত্রের উপর অধ্যয়ন করেন । এরপর অবশ্য তিনি ইউক্লিডের জ্যামিতির প্রতি মনোনিবেশ করেন । কারণ মেলা থেকে কেনা জ্যোতিষ শাস্ত্রের একটি বইয়ে উল্লেখিত বেশ কিছু রেখাচিত্র তিনি বুঝতে পারছিলেন না । এগুলো বোঝার জন্য ইউক্লিডের জ্যামিতি জানা থাকাটা আবশ্যিক ছিল । তা সত্ত্বেও নিউটন বইটির কিছুই বুঝতে পারছিলেন না । এতে ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি এটি অকিঞ্চিৎকর বই হিসেবে সরিয়ে রাখেন । কিন্তু পরবর্তীতে তার শিক্ষক আইজাক ব্যারো তাকে বইটি আবার পড়তে বলেন । বইটি লেখা হয়েছিল দেকার্তের জ্যামিতিক গবেষণা ও কর্মের উপর।

স্নাতক শিক্ষা গ্রহণকালে নিউটন একটি ছোট বইয়ের তাক বা এ ধরনের কোন স্থানে তার সব বই সাজিয়ে রাখতেন । সেই তাক থেকে নিউটনের সে সময়ে লেখা বেশ কিছু নিবন্ধ পাওয়া গেছে । এই লেখাগুলোর বিষয়ের মধ্যে রয়েছে : কৌণিক বিভাজন, বক্রসমূহের বর্গকরণ, সঙ্গীতের অনন্য সুর সম্বন্ধে কিছু গাণিতিক হিসাব, ভিয়েটা এবং ভ্যান স্কুটেনের জ্যামিতিক সমস্যা, ওয়ালিস রচিত এরিথমেটিক অফ ইনফিনিটিস বইয়ের উপর কিছু মন্তব্য, গোলীয় আলোক গ্লাসের ঘর্ষণের ফলাফল, লেন্সের (পরকলা) ত্রুটি এবং সকল ধরনের রুট বের করার সূত্র। ১৬৬৫ খ্রিস্টাব্দে স্নাতক ডিগ্রি লাভের প্রাক্কালেই নিউটন তার বিখ্যাত দ্বিপদী উপপাদ্য বিষয়ক সূত্র প্রমাণ করেন এবং একইসাথে ফ্লাক্‌সিয়নের পদ্ধতি (method of fluxion) আবিষ্কার বিষয়ক প্রথম তত্ত্ব প্রদান করেন । ট্রিনিটি কলেজের এই দিনগুলো তার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল । কিন্তু ১৬৬৫ খ্রিস্টাব্দে কেমব্রিজ এবং লন্ডনে প্লেগ রোগ মহামারী আকার ধারণ করে। এর ফলে কলেজ অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়। নিউটন লিংকনশায়ারে তাদের খামার বাড়িতে ফিরে যান।

·       লিংকনশায়ারে গবেষণা কাজ


উল্‌সথর্প ফিরে এসেও নিউটন থেমে থাকেননি । সেখানে মূলত রসায়ন এবং আলোকবিজ্ঞান বিষয়ের উপর বিভিন্ন পরীক্ষণ চালিয়ে যেতে থাকেন এবং একইসাথে চলতে থাকে তার গাণিতিক অনূধ্যানের প্রকল্পসমূহ । নিউটন তাঁর মহাকর্ষ তত্ত্ব আবিষ্কার বিষয়ক দিনপঞ্জির সূচনা চিহ্নিত করেছিলেন এই ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দকেই, যে বছর তাঁকে ট্রিনিটি কলেজ ছেড়ে যেতে হয়েছিল । এ সম্বন্ধে তিনি বলেছেন:

“একই সালে আমি চাঁদের কক্ষপথে বিস্তৃত অভিকর্ষ নিয়ে চিন্তা করতে শুরু করি,... চাঁদকে তার নিজ কক্ষপথে ধরে রাখতে প্রয়োজনীয় বল এবং পৃথিবীর পৃষ্ঠতলে বিরাজমান অভিকর্ষ বলের মধ্যে তুলনা করি এবং এই দুটি বলের মান প্রায় সমান বলে চিহ্নিত করতে সক্ষম হই ।”

একই সময়ে তিনি আলোকবিজ্ঞান বিষয়ে তার একটি মৌলিক পরীক্ষণের কাজ সম্পন্ন করেন। এই পরীক্ষণের মাধ্যমে তিনি সাদা আলোর গাঠনিক অংশসমূহ আবিষ্কারে সক্ষম হন। আলোকবিজ্ঞান বিষয়ে তার প্রাথমিক এই কাজ সম্বন্ধে নিউটন নিজেই মন্তব্য করেছেন:

“এই সব কিছু আমি করেছিলাম মাত্র দুই বছর তথা ১৬৬৫ এবং ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে, কারণ আমার জীবনের যেকোন সময়ের তুলনায় ওই সময়ে আমি বিশেষ উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে ছিলাম যে পর্যায়ে উদ্ভাবন এবং মনকেন্দ্রিক গণিত ও দর্শন চিন্তার বিকাশ ঘটেছিল ।”

·       আলোক বিজ্ঞান বিষয়ক গবেষণা

১৬৬৭ খ্রিস্টাব্দে ট্রিনিটি কলেজ পুনরায় খোলা হয়। এবার কলেজ নিউটনকে ফেলো নির্বাচিত করে এবং এর দুই বছর পর অর্থাৎ তাঁর ২৭তম জন্মদিনের কিছুদিন আগে তিনি সেখানকার গণিত বিভাগের লুকাসীয় অধ্যাপক নিযুক্ত হন । তার আগে ট্রিনিটি কলেজের এই পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন তারই বন্ধু ও শিক্ষক ডঃ বারো । তখনকার সময়ে কেমব্রিজ এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেলো হতে হলে কাউকে অবশ্যই প্রতিষ্ঠিত অ্যাংগ্লিকান ধর্মপ্রচারক হতে হতো । আবার লুকাসীয় অধ্যাপকদের গির্জার সাথে যোগাযোগ থাকা নিষিদ্ধ ছিল, কারণ তা বৈজ্ঞানিক গবেষণার ক্ষতি করতে পারে । নিউটন লুকাসীয় অধ্যাপক হওয়ার সময় এই শর্ত থেকে নিজে অব্যাহতি চান । তখনকার রাজা দ্বিতীয় চার্লস তাঁর দাবী মেনে নিয়ে তাকে অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত করেন । এতে অ্যাংগ্লিকানদের সাথে নিউটনের ধর্মীয় চিন্তাধারার বিরোধের অবসান ঘটে । এরই মধ্যে ১৬৬৮ খ্রিস্টাব্দে নিউটন একটি প্রতিফলন দূরবীক্ষণ যন্ত্র তৈরি করে ফেলেছিলেন । ১৬৭১ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বরে নিউটন দ্বিতীয় আরেকটি দূরবীন তৈরি করে রয়াল সোসাইটিকে উপহার দেন । এর দুই মাস পর রয়্যাল সোসাইটির একজন ফেলো হিসেবে তিনি আলো সম্বন্ধে তাঁর আবিষ্কারসমূহ প্রচার করেন এবং এর মাধ্যমে আলো সম্বন্ধে একটি বিতর্কের সূচনা করেন । অনেক বছর ধরে এই বিতর্ক অব্যাহত ছিল। এই বিতর্কে অংশ নিয়েছিলেন রবার্ট হুক, লুকাস, লিনাস পাউলিং এবং আরো অনেকে । নিউটন অবশ্য এ ধরনের বিতর্ককে সবসময়ই বিস্বাদ জ্ঞান করতেন । আলো সম্বন্ধে এতো গুরুত্বপূর্ণ একটি তত্ত্বের পক্ষে অবস্থান নিয়ে একটি বিতর্কের জন্ম দেয়ার জন্য তিনি নিজের প্রজ্ঞাকেই দোষারোপ করতেন । আলোক বিজ্ঞান সম্বন্ধে তার গবেষণাপত্রসমূহের অধিকাংশই ১৬৭২ থেকে ১৬৮৪ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রয়েল সোসাইটি থেকে প্রকাশিত হয় । তার এই গবেষণাপত্রগুলোই ১৭০৪ খ্রিস্টাব্দে তার অপটিক্‌স (OPTIKS) নামক গ্রন্থে সংকলিত হয়েছিল।

 

·       প্রিন্সিপিয়া ম্যাথামেটিকা প্রকাশ

১৬৮৪ খ্রিস্টাব্দের পূর্বে নিউটন মহাকর্ষ সম্বন্ধে তার গবেষণাকর্মগুলো প্রকাশের তেমন কোন তাগিদ অনুভব করেননি । এর মধ্যে হুক, এডমান্ড হ্যালি এবং স্যার ক্রিস্টোফার রেন মহাকর্ষ সম্বন্ধে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু তত্ত্ব বা তথ্য আবিষ্কার করেছিলেন যদিও তারা কেউই গ্রহের কক্ষপথ সম্বন্ধে কোন সুনির্দিষ্ট তত্ত্ব প্রদানে সক্ষম হননি। ঐ বছর বিজ্ঞানী এডমুন্ড হ্যালি এ বিষয়টি সম্বন্ধে নিউটনের সাথে কথা বলেন এবং এই দেখে অবাক হন যে নিউটন বিষয়টি এতোদিনে সমাধান করে ফেলেছেন। নিউটন হ্যালির কাছে চারটি উপপাদ্য এবং সাতটি সমস্যা প্রস্তাব করেন যেগুলো তার গবেষণা কাজের মূল অংশ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আসছে । ১৬৮৫ এবং ১৬৮৬ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে প্রায় সতের-আঠার মাস জুড়ে তার লেখা সবচেয়ে বিখ্যাত গ্রন্থ তথা ‘ফিলোসফিয়া ন্যাচারালিস প্রিন্সিপিয়া ম্যাথামেটিকা’ রচনা করেন যার ইংরেজি নাম দেয়া হয় ‘Mathematical Principles of Natural Philosophy’ । এই গ্রন্থের তিনটি অংশ আছে । নিউটন তৃতীয় অংশটিকে সংক্ষিপ্ত করতে চেয়েছিলেন । কিন্তু হ্যালি তাকে তৃতীয় অংশটি বিস্তারিত লেখার ব্যাপারে উৎসাহিত করেন। রয়্যাল সোসাইটি গ্রন্থটি প্রকাশের অর্থ সংকুলানে অপারগতা প্রকাশ করে । এবারও হ্যালিই এগিয়ে আসেন । তিনি বইটি প্রকাশের সমস্ত ব্যয়ভার বহন করেন এবং এর ফলে ১৬৭৮ খ্রিস্টাব্দে পদার্থবিজ্ঞান ও গণিতের ইতিহাসে অবিস্মরণীয় এই বইটি প্রকাশিত হয় । প্রকাশের পর সমগ্র ইউরোপ জুড়ে এটি বিপুল সাড়া জাগাতে সক্ষম হয় । এরই ধারাবাহিকতায় তখনকার সময়ের সবচেয়ে বিখ্যাত বিজ্ঞানী হিসেবে খ্যাত ক্রিশ্চিয়ান হাইগেন্‌স ১৬৮৯ খ্রিস্টাব্দে নিউটনের সাথে ব্যক্তিগতভাবে সাক্ষাৎ করার জন্য ইংল্যান্ডে যান ।

 

·       সরকারি চাকরি ও ধর্মতত্ত্ব বিষয়ে গবেষণা

প্রিন্সিপিয়া গ্রন্থে উল্লেখিত মূলনীতিসমূহ নিয়ে কাজ করার সময়ই নিউটন বিশ্ববিদ্যালয় কার্যাবলিতে আরও সক্রিয় হয়ে উঠেন। এ সময় রাজা দ্বিতীয় জেমস বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বময় কর্তৃত্ব এবং আনুগত্যের শপথ অস্বীকার করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন । নিউটন তাঁর এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ ও বিরোধিতা করায় কেমব্রিজ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন । রাজনীতির কাজ শেষে যখন তিনি পুনরায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসেন তখন গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন । এই অসুস্থতার কারণে ১৬৯২ থেকে ১৬৯৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি প্রায় সকল কর্মে অক্ষম ছিলেন। এর ফলে তার সহকর্মী ও বন্ধু-বান্ধবের মাঝে প্রভূত উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছিল। আরোগ্য লাভের পর তিনি বিশ্ববিদ্যালয় ত্যাগ করে সরকারের জন্য কাজ শুরু করেন। তার বন্ধু লক, রেন এবং লর্ড হালিফাক্সের সহযোগিতায় তিনি প্রথমে ১৬৯৫ খ্রিস্টাব্দে ইংলেন্ড সরকারের ওয়ার্ডেন অফ দ্য মিন্ট এবং পরবর্তীতে মাস্টার অফ দ্য মিন্ট পদে অধিষ্ঠিত হন। আমৃত্যু তিনি এই মাস্টার অফ দ্য মিন্ট পদেই বহাল ছিলেন।

 

অপর দিকে জীবনের প্রথম ভাগ থেকেই নিউটন ধর্মতত্ত্ব বিষয়ে পড়াশোনা করে আগ্রহ পেতেন। ১৬৯০ খ্রিস্টাব্দের আগে থেকেই তিনি ধর্মীয় ভবিষ্যদ্বাণী নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন । সে সময় তিনি লকের কাছে লেখা পত্রে এ সম্বন্ধে বিস্তারিত বর্ণনা দেন । এই পত্রটির নাম ছিল An Historical Account of Two Notable Corruptions of The Scriptures । এই পত্রটি ট্রিনিটির দুইটি প্যাসেজ বিষয়ে লেখা । এছাড়াও তিনি মৃত্যুর পূর্বে একটি পাণ্ডুলিপি লিখে যান। এর নাম Observations on the Prophecies of Daniel and the Apocalypse । এছাড়াও বাইবেলের কিছু সমালোচনা, ভাষ্য ও টীকা তিনি রচনা করেছিলেন ।

 

·       ব্যক্তিগত সম্পর্ক

জনৈকা মিস স্টোরির সাথে নিউটনের বাগদান হয়, কিন্তু পড়াশোনা ও গবেষণায় খুব বেশি নিমগ্ন থাকার কারণে নিউটন বিয়ে করেন নি।

·       গবেষণা কর্ম ও আবিষ্কার

১. গণিত

বর্তমানকালের গণিতজ্ঞ ও ইতিহাসবিদদের মতে নিউটন এবং লাইবনিৎস প্রায় একই সাথে গণিতের একটি নতুন শাখার উন্নয়ন ঘটিয়েছিলেন যা ক্যালকুলাস নামে পরিচিতি লাভ করে। এটি গণিত এবং পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে একটি বিপ্লবের জন্ম দিতে সক্ষম হয়েছিল। অবশ্য ক্যালকুলাসের প্রকৃত উদ্ভাবক কে তা নিয়ে অনেক সংশয় ও বিরোধ রয়েছে। বিজ্ঞানী স্টিভেন হকিং তার ‘সময়ের ইতিবৃত্ত’ (A Brief History of Time) গ্রন্থে নিউটনকে ধুরন্ধর ও মিথ্যাবাদী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এই বিষয়টি নিয়ে একটি প্রবল বিতর্কের জন্ম হয়েছিল যা নিউটন বনাম লিবনিৎস ক্যালকুলাস বিতর্ক নামে বহুল পরিচিত । এ নিয়ে সমালোচনা অনুচ্ছেদে বিস্তারিত লেখা হয়েছে ।

 

নিউটন দ্বিপদী উপপাদ্যের একটি সাধারণ রুপ উদ্ভাবনের জন্য বিখ্যাত । এই রুপটি যেকোন ঘাতের জন্য প্রযোজ্য হয় । এছাড়াও নিউটন আবিষ্কার করেন : নিউটনের আইডেনটিটি, নিউটনের পদ্ধতি, শ্রেণীবিন্যাসকৃত ঘনতলীয় বক্র (দ্বিচলবিশিষ্ট তিন মাত্রার বহুপদী)। তিনি সসীম পার্থক্যের তত্ত্বের উপর গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন, প্রথম ব্যক্তি হিসেবে fractional indice ব্যবহার করেন এবং দিওফান্তিন সমীকরণ প্রমাণ করার জন্য স্থানাঙ্ক জ্যামিতি প্রয়োগ করেন । নিউটন লগারিদমের মাধ্যমে হারমোনিক ধারার আংশিক সমষ্টির আনুমানিক মান নির্ণয় করেন যা অয়লারের যোগফল সূত্রের পূর্বসূরী হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকে । তিনিই প্রথম আত্মবিশ্বাসের সাথে পাওয়ার সিরিজ ব্যবহার করেন এবং একে রিভার্ট করেন। এছাড়া পাই-এর জন্য একটি নতুন সূত্র আবিষ্কার করেন।

 

 

·        ২. আলোকবিজ্ঞান

১৬৭০ থেকে ১৬৭২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত নিউটন আলোক বিজ্ঞানের উপর বক্তৃতা প্রদান করেন । এ সময় তিনি আলোর প্রতিসরণ আবিষ্কার করেন । প্রিজম পরীক্ষার মাধ্যমে তিনি এ আবিষ্কার করেছিলেন । তিনি পরীক্ষা করে দেখেন, একটি ত্রিভুজাকার প্রিজমের মধ্য দিয়ে অতিক্রান্ত সাদা আলোকে একটি পর্দার উপর ফেললে তা আলোকীয় বর্ণালিতে বিশ্লিষ্ট হয় । আবার একটি লেন্স এবং দ্বিতীয় আরেকটি প্রিজমের মাধ্যমে এ বহুবর্ণী আলোকে সংশ্লিষ্ট করে সাদা আলোতে পরিণত করা সম্ভব । তিনি দেখান বর্ণীল আলো থেকে একটি বর্ণের রশ্মিকে পৃথক করে বিভিন্ন বস্তুর উপর ফেললেও এর ধর্মের কোন পরিবর্তন হয় না । তিনি দেখতে পান প্রতিসরিত, বিক্ষিপ্ত বা সঞ্চালিত যা-ই হোক না কেন আলোর বর্ণ সব সময় একই থাকে । সুতরাং, আমরা যে বর্ণ পর্যবেক্ষণ করি তা আপতিত বর্ণীল আলোর সাথে বস্তুর মিথস্ক্রিয়ার ফলাফল; বস্তু কখনই বর্ণ তৈরি করতে পারে না ।

তার এ সকল গবেষণা কর্ম থেকে তিনি মন্তব্য করেন, যে কোন প্রতিসরণ দূরবীক্ষণ যন্ত্র আলোর বিভিন্ন বর্ণে বিশ্লিষ্ট হয়ে যাওয়ার সমস্যায় ভুগবে। এ সমস্যাকে অতিক্রম করার জন্য তিনি একটি প্রতিফলন দূরবীক্ষণ যন্ত্র নির্মাণ করেন যা বর্তমানে নিউটনীয় দূরবীক্ষণ যন্ত্র নামে পরিচিত । নিউটনের বলয় ব্যবহার করে নিজের দূরবীনে ব্যবহৃত দর্পণে শান দেয়ার মাধ্যমে তিনি তার দূরবীক্ষণ যন্ত্রটির আলোকীয় কর্মক্ষমতার মান সম্বন্ধে ধারণা লাভে সক্ষম হয়েছিলেন । এভাবে তিনি প্রতিসরণ দূরবীনের চেয়ে কর্মক্ষম ও উঁচুদরের দূরবীন তৈরি করেন যাতে দর্পণের ব্যাস ছিল আগের চেয়ে বেশী । ১৬৭১ খ্রিস্টাব্দে রয়্যাল সোসাইটি তাঁর প্রতিসরণ দূরবীনের একটি প্রদর্শনী দেওয়ার আহ্বান জানায়। এদের উৎসাহেই তিনি তাঁর আলোক বিজ্ঞান বিষয়ক গবেষণা “অন কালার” নামক একটি গবেষণা পত্র প্রকাশ করেন যা পরবর্তীতে তার বিখ্যাত গ্রন্থ অপটিক্‌স-এর অন্তর্ভুক্ত হয় । রবার্ট হুক নিউটনের কিছু চিন্তাধারা সমালোচনা করায় নিউটন সকল ধরনের গণ বিতর্ক থেকে ইস্তফা দেন । হুকের মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তারা পরস্পরের শত্রু ছিলেন।

আলো কণা দিয়ে তৈরি এবং ঘনতর মাধ্যমে চলার সময় আলোর প্রতিসরণ ঘটে, এ ধারণা নিউটন প্রথমটায় বিশ্বাস করতেন না । অবশ্য পরে তিনি আলোকে তরঙ্গ এবং কণা উভয়টি দ্বারা গঠিত হিসেবে কল্পনা করে আলোর অপবর্তন (Diffraction) ব্যাখ্যা করতে সমর্থ হয়েছিলেন । পরবর্তীতে পদার্থবিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন যে, আলোকে একেবারে বিশুদ্ধ তরঙ্গ হিসেবে ধরে না নিলে এর অপবর্তণ কোনভাবেই ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয় । বর্তমানকালের কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞান, ফোটন এবং তরঙ্গ-কণা দ্বিত্ব নিউটন আলোকে যেভাবে বুঝেছিলেন তারই এক ক্ষুদ্র সাদৃশ্যমাত্র।

১৬৭৫ খ্রিস্টাব্দে আলোকীয় প্রকল্প প্রদানের সময় নিউটন দুটি কণার মধ্যে বলের আদান-প্রদাণ ঘটানোর মাধ্যম হিসেবে ইথারের অস্তিত্ব থাকতে পারে বলে ঘোষণা করেন । ধর্মতাত্ত্বিক সোফিবাদে বিশ্বাসী হেনরি মুরের সাথে যোগাযোগ থাকার সুবাদে নিউটন এ সময় আলকেমি নিয়ে আগ্রহী হয়ে উঠেন । হার্মেটীয়রা কণাসমূহের মধ্যবর্তী আকর্ষণ-বিকর্ষণের কারণ হিসেবে এক ধরনের অতিলৌকিক বলের কল্পনা করতো । নিউটন তার ইথার তত্ত্বকে এই অতিলৌকিক বলের ধারণা দ্বারা প্রতিস্থাপিত করেন । জন মেনার্ড কেইনস, যিনি নিউটনের আলকেমি বিষয়ক অনেক লেখা সংগ্রহ করেছেন, তিনি একবার এ বিষয়ে বলেছিলেন, “নিউটন কারণ-অণুসন্ধানের যুগের প্রথম নন, বরং জাদুকরদের যুগের শেষ ব্যক্তি ।” অবশ্য নিউটনের আলকেমি বিষয়ক উৎসাহকে তার বিজ্ঞানের প্রতি অবদান থেকে আলাদা করে দেখার কোন উপায় নেই । তখন আলকেমি এবং বিজ্ঞানের মধ্যে কোন সুস্পষ্ট পার্থক্য রেখা টানা ছিল না । শূন্যস্থানের মধ্য দিয়ে এক অতিলৌকিক ক্রিয়া দূরত্ব থাকা সত্ত্বেও কাজ করে, এ ধারণা যদি নিউটন না করতেন, তাহলে হয়তো তার অভিকর্ষ বিষয়ক তত্ত্ব আবিষ্কারই সম্ভব হতো না।

১৭০৪ খ্রিস্টাব্দে নিউটন অপটিক্‌স নামক একটি গ্রন্থ লেখেন যাতে তিনি আলোর কণা তত্ত্ব বিষয়ে তার অভিমত বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেন । তার মত ছিল, আলো অসংখ্য অতি সূক্ষ্ম কণা দ্বারা গঠিত এবং সাধারণ পদার্থগুলোর গাঠনিক উপাদান হচ্ছে অপেক্ষাকৃত স্থুল কণা । তিনি নিজেকেই প্রশ্ন করেন, “এক ধরনের আলকেমিজাত ট্রান্সম্যুটেশনের মাধ্যমে কি সাধারণ পদার্থের স্থুল কণার সাথে আলোর মধ্যকার সূক্ষ্ণ কণাসমূহের পারষ্পরিক রুপান্তর ঘটানো সম্ভব নয়, এবং যে আলো কোন বস্তুর মধ্যে প্রবেশ করে সে আলোর মধ্যবর্তী কণাসমূহের কারণে কি বস্তুটি তার অনেকগুলো ক্রিয়া করতে সক্ষম হয়না ?” এছাড়াও নিউটন কাচের গ্লোব ব্যবহার করে একটি আদি প্রকারের ঘর্ষণ স্থির-বৈদ্যুতিক জেনারেটর তৈরি করতে সক্ষম হন।

 

·       ৩. বলবিজ্ঞান এবং মহাকর্ষ

১৬৭৯ খ্রিস্টাব্দে নিউটন বলবিজ্ঞান এবং বিশেষত মহাকর্ষ এবং গ্রহসমূহের উপর এর প্রভাব বিষয়ে তার নিজস্ব গবেষণায় ফিরে আসেন। এক্ষেত্রে গ্রহীয় গতি সম্বন্ধে কেপলারের সূত্রকে তিনি তথ্যসূত্র হিসেবে ব্যবহার করেন এবং রবার্ট হুক ও জন ফ্ল্যামস্টিডের সাথে এ নিয়ে আলোচনা করেন। প্রাপ্ত ফলাফলসমূহ তিনি “দ্য মটু করপোরাম” (১৬৮৪)-এ প্রকাশ কেন। প্রিন্সিপিয়া বইয়ের প্রাথমিক নীতিসমূহ এই প্রকাশনাতেই বিধৃত হয়েছিল ।

 

১৬৮৭ খ্রিস্টাব্দের ৫ই জুলাই তিনি তার ফিলসফিয়া ন্যাচারালিস প্রিন্সিপিয়া ম্যাথামেটিকা নামক বিখ্যাত গ্রন্থটি প্রকাশ করেন । সাহস এবং অর্থের যোগান দেয়ার আধ্যমে এই বইয়ের প্রকাশনায় যিনি সবচেয়ে বেশী অবদান রেখেছেন তিনি হলেন বিজ্ঞানী এডমন্ড হ্যালি । এই বইয়েই নিউটন গতির তিনটি মৌলিক সূত্রের উল্লেখ করেন। তিনি বস্তুসমূহের মধ্যবর্তী বলকে প্রকাশ করার জন্য লাতিন ভাষায় গ্রাভিটাস শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন; এই শব্দটিই পরবর্তীকালে মহাকর্ষ বল নামে পরিচিত হয়। এটি প্রকৃতির অন্যতম একটি মৌলিক বল । নিউটন এ বিষয়ের উপর একটি তত্ত্বের অবতারণা করেন যা নিউটনের মহাকর্ষ সূত্র নামে পরিচিত । একই গ্রন্থে নিউটন বাতাসে শব্দের বেগের প্রথম বিশ্লেষণমূলক নির্ণয় প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করেন। বয়েলের সূত্রের উপর ভিত্তি করে তিনি এই ব্যাখ্যা প্রদান করেছিলেন । প্রিন্সিপিয়া গ্রন্থের মাধ্যমে নিউটন আন্তর্জাতিক মহলে বিশেষ পরিচিতি লাভ করেন। তার একটি প্রশংসাকারী মহল সৃষ্টি হয় যার মধ্যে অন্যতম ছিলেন সুইজার‌ল্যান্ডে জন্মগ্রহণকারী গণিতবিদ নিকোলাস ফাটিও দ্য ডুইলিয়ার। এই গণিতবিদের সাথে নিউটন বিশেষ বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন যা ১৬৯৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বিরাজমান ছিল। এই বন্ধুত্ব ভেঙে যাওয়ার পর নিউটন মুষড়ে পড়েছিলেন।

গতির সূত্র এবং সর্বজনীন মহাকর্ষ সূত্র নিউটনের সেরা দুইটি আবিষ্কার হলেও এদের ব্যবহার সম্পর্কে তিনি সবসময়ই বিশেষ সতর্ক ছিলেন। এই তত্ত্বদ্বয়ের আশ্রয় নিয়ে মহাবিশ্বকে কেবলমাত্র একটি যন্ত্র আখ্যা দেওয়া এবং একটি মহামহিম ঘড়ির নিয়ন্ত্রণের এর বিকাশকে ব্যাখ্যা করা— এমনতর ব্যবহারের ঘোড় বিরোধী ছিলেন তিনি । এ সম্বন্ধে তিনি বলেন:

“অভিকর্ষ গ্রহসমূহের গতির বিষয়টি ব্যাখ্যা করে, কিন্তু এটি ব্যাখ্যা করতে পারেনা, কে গ্রহগুলোকে গতিশীল হিসেবে নির্দিষ্ট স্থানে স্থাপন করে দিলে। ঈশ্বর সকল কিছু নিয়ন্ত্রণ করেন এবং যা কিছু ঘটছে বা যা কিছু ঘটা সম্ভব তার সবই তিনি জানেন ।”

বিজ্ঞান চর্চা নিউটনের ধর্মীয় সাধনায় কোন ব্যাঘাত ঘটাতে পারেনি । তিনি প্রতিদিন নিয়মিত বাইবেল অধ্যয়ন করতেন এবং চার্চের আদি পিতারা ছিলেন নিউটনের অন্যতম অণুপ্রেরণা । এমনকি বিজ্ঞানের চেয়ে তিনি ধর্ম গ্রন্থ, ধর্মীয় পিতা এবং আলকেমি অধ্যয়ন করে অধিক সময় ব্যয় করতেন। তিনি নিজেই বলেছেন, বাইবেলকে তিনি ঈশ্বরের শব্দ হিসেবে মৌলিকভাবে বিশ্বাস করেন এবং ঈশ্বর কর্তৃক অণুপ্রাণিত ব্যক্তিরাই এটি রচনা করেছেন বলেও তার বিশ্বাস ছিল । তিনি নিজেও এসব গ্রন্থ-রচনার সমালোচনামূলক একটি বই লিখেছেন যার নাম অ্যান হিস্টরিক্যাল অ্যাকাউন্ট অফ টু নোটেব্‌ল করাপশন্‌স অফ স্ক্রিপচার। নিউটন নির্ধারণ করেছিলেন যে, ৩৩ খ্রিস্টাব্দের ৩ এপ্রিল যিশু খ্রিস্টকে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছে । প্রথাগতভাবে গ্রহণযোগ্য তারিখের সাথে তার গণনাকৃত এই তারিখের মিল ছিল । নিউটন বাইবেলের মধ্যকার গুপ্ত তথ্যসমূহ অণুসন্ধানের চেষ্টা করেছিলেন, যদিও একাজে তার সফলতা আসেনি । ধর্মতত্ত্ব এবং আলকেমি বিষয়ে তার বিশেষ উৎসাহ থাকলেও অন্য অনেকের মত তিনি অন্ধভাবে তিনি এগুলোর চর্চা করেননি, বরং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির মাধ্যমে এগুলোর পরীক্ষণ পরিচালনা করেছেন । তার কাছে ধর্ম এবং বিজ্ঞান নিয়ে তার করা তার পরীক্ষণগুলো একই । কারণ উভয়েরই লক্ষ্য বিশ্ব কিভাবে ক্রিয়া করছে তা পর্যবেক্ষণ এবং বোঝার চেষ্টা করা।

 

নিউটন ট্রিনিটিতে চার্চের আইনসমূহ অমান্য করেন । টি. সি. ফাইজেনমাইয়ার ট্রিনিটি চার্চের সাথে দ্বিমত পোষণ করে বলেছিলেন, নিউটন অধিকাংশ প্রোটেস্ট্যান্ট, অ্যাংগ্লিকান এবং রোমান ক্যাথলিক কর্তৃক পরিচালিত চার্চ তথা পশ্চিমাঞ্চলীয় মৌল বিশ্বাসের প্রতি অতটা আস্থাশীল ছিলেননা; বরং তিনি পূর্বাঞ্চলীয় অর্থোডক্স বিশ্বাসের অণুসারী ছিলেন। সমকালীন সময়ে নিউটনকে একজন রসিক্রুশিয়ান হিসেবেও সন্দেহ করা হতো। অবশ্য রয়েল সোসাইটি এবং রাজা চার্লস ২-এর বিচারালয়ের অনেকেই এই মতবাদের অণুসারী ছিলেন। জীবদ্দশায় বিজ্ঞানের চেয়ে নিউটন ধর্ম বিষয়েই বেশি লিখেছেন। তিনি যুক্তিসম্মতভাবে একটি চিরন্তন বিশ্বের ধারণা পোষণ করতেন; কিন্তু হাইলোজোইজম-এ বিশ্বাস করেননি কখনও, যা গটফ্রিড লাইবনিৎস এবং বারুচ স্পিনোজার মধ্যে প্রচ্ছন্ন ছিল। তার মতে নিয়মতান্ত্রিক এবং গতিশীল মহাবিশ্ব একটি সক্রিয়া কারণ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, কিন্তু সেজন্যে এটিকে অবশ্যই হতে হবে নিয়মিত।

 

·       ধর্মীয় চিন্তার উপর নিউটনের প্রভাব

উইলিয়াম ব্লেইককৃত নিউটন। এখানে তাকে 'স্বর্গীয় জিওমিটার' হিসেবে দেখানো হয়েছে । যুক্তিবাদী গ্রন্থকারেরা নিউটন এবং রবার্ট বয়েলের যান্ত্রিক দর্শনকে উন্নত করে তাকে একটি গ্রহণযোগ্য মর্যাদায় ভূষিত করেছিল। তাদের কাছে এটি ছিল সর্বেশ্বরবাদ এবং এনথুসিয়াজ্‌ম-এর একটি বিকল্প। ল্যাটিচুডিনারীয়দের মত সকল গোঁড়াবাদী এবং বিসংবাদী (dissident) ধর্মপ্রচারকরাই তার এই চিন্তাধারাকে দ্রুত গেহণ করে নিয়েছিল। এ হিসেবে তখন, বিজ্ঞানের সরল বর্ণনা এবং ব্যাখ্যাকে কুসংস্কারাচ্ছন্ন এনথুসিয়াজ্‌ম-এর আবেগী এবং অধিবিদ্যাগত সর্বপ্রধান বিষয়সমূহের সাথে বিতর্কে বা যুদ্ধে উপনীত হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় একটি উপকরণ জ্ঞান করা হয়েছিল। একই সাথে সমকালীন ইংরেজদের মত তরঙ্গের মত বর্ধনশীল ঈশ্বরবাদরাও নিউটনের আবিষ্কারসমূহকে ব্যবহার করে প্রমাণ করতে চেয়েছিল যে, একটি প্রাকৃতিক ধর্মের অস্তিত্ব রয়েছে।

মহাবিশ্ব সম্বন্ধে বয়েলের যান্ত্রিক ধারণা, প্রাক-আলোকিত যুগের জাদুকরী ধারণাসমূহ এবং খ্রিস্টান ধর্মের রহস্যাবৃত উপকরণসমূহের বিরুদ্ধে যে আক্রমণ পরিচালিত হয়েছিল তাকে একটি ভিত্তির উপর দাঁড় করিয়ে দেয়। নিউটন কেবল গাণিতিক প্রমাণের মাধ্যমে বয়েলের চিন্তাধারাকে পূর্ণতা দান করেন। একই সাথে তিনি একে জনপ্রিয় করে তোলার পিছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মধ্যস্থতাকারী ঈশ্বরের ধারণাকে পরিত্যাগ করে নিউটন এমন একটি মহাবিশ্বের ধারণাকে পুনর্জীবন দান করেছিলেন, যা একজন ঈশ্বরের সুনিপুণ হাতে নির্মিত হয়েছে এবং যুক্তিসঙ্গত এবং সর্বজনীন মৌল নীতির মাধ্যমে যার সমগ্র নকশা করা হয়েছে।

নিউটন ঈশ্বরকে এমন একজন মহান স্রষ্টা হিসেবে দেখেছেন, সমগ্র সৃষ্টিজগতের এই বিশালতার মুখেও যার অস্তিত্বকে অস্বীকার করা যায় না । কিন্তু অদূরদর্শী ধর্মতাত্ত্বিক গবেষণার শেষে এখন ঈশ্বরকে বিশ্ব পরিচালনার ক্রিয়াকর্ম থেকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়েছে; অন্তত নিউটনের নীতি বিষয়ে বলতে গিয়ে লাইবনিজ এ বিষয়টির দিকেই সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন । কারণ ধারণা করা হচ্ছে, বিশ্ব পরিচালনায় মধ্যস্থতার ধারণা মেনে নিলে ঈশ্বরের সৃষ্টির মধ্যেই একটি ত্রুটির ধারণা প্রকট হয়ে উঠে; একজন মহাপরাক্রমশালী ও সব দিক দিয়ে সঠিক স্রষ্টার পক্ষে যা সৃষ্টি করা সম্ভব হতে পারেনা। এই কারণ দর্শানোর মাধ্যমে সব কিছু করা হলো, অথচ নিউটন নিজে কখনই এই কারণের দিকে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেননি। লাইবনিজের ব্যাখ্যার মাধ্যমে নিজের সৃষ্ট জগৎ থেকে স্রষ্টার ধারণাকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলা হয়েছে। ঈশ্বরবিহীন এই মহাবিশ্বে তাই এখন কেবল মানুষের রাজত্ব। মানুষই এর সৃষ্টি ও পরিচালনা প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করার দাবীদার এবং সে-ই জগৎের সব অনিষ্ট অপসারণের ক্ষমতার অধিকারী। অপরদিকে, ল্যাটিচুডিনারিয়ান এবং নিউটনীয় ধারণাকে আত্মস্থ করার মাধ্যমে জন্ম নিয়েছে ধর্মের আরেকটি নতুন দল যারা মিলেনারিয়ান নামে পরিচিত। এরা যান্ত্রিক মহাবিশ্বের ধারণা বিশ্বাসী। কিন্তু এই বিশ্বাস নিয়ে গবেষণা করতে গিয়েও মিলেনারিয়ানরা সেই প্রাচীন এনথুসিয়াজ্‌ম এবং রহস্যময়তার সম্মুখীন হয়েছেন যার মুলোৎপাটন করার জন্য এনলাইটেনমেন্টের যুগে অনেক প্রচেষ্টাই করা হয়েছে ।

·       বিশ্বের সমাপ্তি সম্বন্ধনীয় ধারণা

১৭০৪ খ্রিস্টাব্দে লেখা একটি পাণ্ডুলিপিতে নিউটন বাইবেল থেকে বৈজ্ঞানিক তথ্য বের করে আনার জন্য তার প্রচেষ্টার কথা লিখেছেন। তিনি অনুমান করেছিলেন যে, ২০৬০ খ্রিস্টাব্দের পূর্বে পৃথিবী ধ্বংস হবে না। এই ভবিষ্যদ্বাণী করতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন:

“আমি এটি এজন্য উল্লেখ করিনি যে, বিশ্ব চরাচর কখন ধ্বংস হবে তার সময় আমি সবাইকে জানাতে চাই; বরং এজন্য যে, কল্পনার রাজ্যে বসবাসকারী ব্যক্তিরা বিশ্বের ধ্বংস সম্বন্ধে যা বলছেন তার সবগুলোকে একটি সীমার মধ্যে বেঁধে দেয়া। এবং এটি করার মাধ্যমে আমি পবিত্র ভবিষ্যদ্বাণীসমূহের যেটি ব্যর্থ প্রমাণিত হবে তাকে সাথে সাথে বিফল হিসেবে চিহ্নিত করার উপায় নির্ধারণ করলাম ।”

·       শেষ জীবন

জীবনের শেষ ৩০ বছর নিউটন গাণিতিক মূলনীতিসমূহের উপর খুব কমই মৌলিক অবদান রাখতে পেরেছেন। কিন্তু এ বিষয়ে তার উৎসাহ এবং দক্ষতার কোন অভাব তখনও ছিল না। ১৬৯৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি এক রাতে একটি গাণিতিক সমস্যার সমাধান করে ফেলেন। এই সমস্যাটি বার্নোলি একটি প্রতিযোগিতায় প্রস্তাব করেছিলেন এবং এর সমাধানের সময় বরাদ্দ ছিল ৬ মাস । আবার ১৭১৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি মাত্র কয়েক ঘণ্টায় একটি সমস্যার সমাধান করে ফেলেন। বিজ্ঞানী লাইবনিৎস এই সমস্যাটিকে ইংরেজ বিশেষজ্ঞদের জন্য রোমহর্ষক এবং দুঃসাধ্য বলে উল্লেখ করেছিলেন। এ সময় দুইটি বিষয়ে তিনি বেশ উদ্বিগ্ন ছিলেন। একটি হল তার কিছু জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার জ্যোতির্বিজ্ঞানী রয়েলের পর্যবেক্ষণের সাথে খাপ খায়নি । এ নিয়ে একটি বিতর্ক ছিল । অন্যটি হল ক্যালকুলাস আবিষ্কার নিয়ে লিবনিৎসের সাথে বিতর্ক ও বিরোধ । তিনি প্রিন্সিপিয়া গ্রন্থটিকে পুনরায় সংশোধন করে ১৭১৩ খ্রিস্টাব্দে এর নতুন সংস্করণ প্রকাশ করেন ।

নিউটনের বৈজ্ঞানিক গবেষণাসমূহ তাকে প্রভূত সম্মান এনে দিয়েছিল । তিনি ইংল্যান্ডের বিচারালয়ে একজন জনপ্রিয় পরিদর্শক ছিলেন । ১৭০৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি নাইট উপাধিতে ভূষিত হন । সমগ্র মহাদেশ থেকেই তার জন্য বিভিন্ন সম্মাননা এসেছিল । তখনকার নেতৃস্থানীয় সকল বিজ্ঞানীর সাথেই তার যোগাযোগ ছিল । তার সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য এতো অধিক সংখ্যক বিজ্ঞানী ও বিজ্ঞান ছাত্রের আগমন ঘটতো যে তিনি বিরক্ত হয়ে যেতেন । এতো সম্মান পেয়েও নিউটন এক সময় বিনয় প্রকাশ করেছেন । মৃত্যুর কিছুকাল পূর্বে তিনি বলেছিলেন:

“আমি জানিনা বিশ্বের কাছে আমি কিভাবে উপস্থাপিত হয়েছি, কিন্তু আমার কাছে আমার নিজেকে মনে হয় এক ছোট বালক যে কেবল সমুদ্র উপত্যকায় খেলা করছে এবং একটি ক্ষুদ্র নুড়ি বা ক্ষুদ্রতর এবং খুব সাধারণ উপলখণ্ড সন্ধান করছে, অথচ সত্যের মহাসমুদ্র তার সম্মুখে অনাবিষ্কৃত পড়ে রয়েছে ।”

১৭২৫ খ্রিস্টাব্দের পর নিউটনের স্বাস্থ্যের ব্যাপক অবনতি ঘটে । এর ফলে একজন ডেপুটি মিন্টে তার কাজ মওকুফ করার ব্যবস্থা করে দেন । ১৭২৭ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি শেষবারের মত রয়েল সোসাইটির সভাপতি হিসেবে কার্য পরিচালনা করেন । ১৭০৩ খ্রিস্টাব্দ থেকেই তিনি এই সোসাইটির সভাপতি ছিলেন । ১৭২৭ খ্রিস্টাব্দের ২০ই মার্চ ৮৫ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন । তাকে লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবি-তে সমাধিস্থ করা হয় ।

·       আলোকিত যুগের দার্শনিকেরা

আলোকিত যুগের দার্শনিকেরা বিজ্ঞানের জগৎে পূর্বসূরী এবং উত্তরসূরিদের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা প্রকাশ করেন । এই তালিকার মূল ব্যক্তিত্ব ছিলেন গ্যালিলিও, রবার্ট বয়েল এবং নিউটন । বর্তমান যুগের প্রতিটি ভৌত এবং সামাজিক ক্ষেত্রের প্রকৃতি এবং প্রাকৃতিক নিয়মের ধারণা উপস্থাপনে এই তিনজনকে বলা হয়েছে অগ্রদূত এবং পথপ্রদর্শক। এর সাপেক্ষে ইতিহাসের দীক্ষা এবং এর উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠা সামাজিক গঠনকে বাদ দিয়ে দেয়া যায় ।

প্রকৃতি এবং যুক্তি দ্বারা বোধগম্য মৌল নীতিসমূহের আলোকে নিউটনই প্রথম মহাবিশ্বের ধারণাকে পরিষ্কার করতে সমর্থ হন । এজন্য একেই বলা যায় আলোকিত যুগের আদর্শের সূচনা । জন লক এবং ভলতেয়ার রাজনৈতিক পদ্ধতিতে প্রাকৃতিক নিয়মের প্রয়োগ ঘটিয়েছেনএবং এর মাধ্যমে অন্তর্জাত অধিকার সম্বন্ধে উপদেশ দিয়েছেন; অ্যাডাম স্মিথ এবং অনেক ফিজিওক্র্যাটরা মনোবিজ্ঞান এবং আত্ম-চাহিদার প্রাকৃতিক ধারণাসমূহকে অর্থনৈতিক পদ্ধতিতে প্রয়োগ করেন এবং সমাজবিজ্ঞানীরা প্রগতির প্রাকৃতিক নকশার সাথে ইতিহাসের সামঞ্জস্য স্থাপনের চেষ্টা করার জন্য বর্তমান সামাজিক আইনের সমালোচনা করেন। মনোবদ্দো এবং স্যামুয়েল ক্লার্ক নিউটনের গবেষণার উপাদানসমূহ নিয়ে কাজ করা থেকে বিরত থেকেছেন, কিন্তু অনিবার্যভাবেই প্রকৃতি সম্বন্ধে তাদের শক্তিশালী ধর্মীয় চিন্তাধারার সাথে বিরোধ স্থাপনের জন্য তারা নিউটনের গবেষণা যুক্তি দিয়ে বোঝার চেষ্টা করতে বাধ্য হয়েছেন।

·       নিউটনের আপেল

নিউটনের আপেল গাছটির একটি বিখ্যাত বংশধর । কেমব্রিজের বোটানিক্যাল গার্ডেনে এটি পাওয়া গেছে ।

“When Newton saw an apple fall, he found, in that slight startle from his contemplation, it's said, a mode of proving that the earth turn’d round in a most natural whirl, called gravitation; and this is the sole mortal who could grapple, since Adam, with a fall, or with an apple.”

গাছ থেকে একটি আপেলতে পড়তে দেখে নিউটন প্রথম সর্বজনীন মহাকর্ষ বলের সূত্র নিয়ে গবেষণায় উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন বলে একটি বিখ্যাত গল্প প্রচলিত রয়েছে। কার্টুনের মাধ্যমে আরও ফুটিয়ে তোলা হয়েছে যে, আপেলটি আসলে নিউটনের মাথায় আঘাত করেছিল এবং এ কারণেই মহাকর্ষের বুদ্ধিটি তার মাথায় খেলে যায়। নিউটনের ভাইয়ের মেয়ের স্বামী এবং রয়েল মিন্টে তার সহকারী জন কন্ডুইট নিউটনের জীবনী লিখতে গিয়ে এই ঘটনাটির বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে:

১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দে নিউটন কেমব্রিজ ছেড়ে লিংকনশায়ারে তার মা'র কাছে চলে আসেন। সেখানকার বাগানে বসে একদিন তিনি গভীর চিন্তায় মগ্ন ছিলেন। এমন সময় তার মাথায় আসে অভিকর্ষ শক্তি (যা একটি আপেলকে গাছ থেকে মাটিতে নামিয়ে নিয়ে আসে) পৃথিবী থেকে কেবল একটি নির্দিষ্ট দূরত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারেনা। সাধারণত যেমনটা চিন্তা করা হয় এই শক্তি নিশ্চয়ই তার থেকে অনেক দূরত্ব পর্যন্ত তার শক্তি বজায় রাখে। নিজের মনে তিনি বলে যেতে থাকেন, এই বলটি কেনইবা চাঁদ পর্যন্ত প্রসারিত হবেনা। আর সেক্ষেত্রে এটি চাঁদের গতিকে প্রভাবান্বিত করে এবং সম্ভবত তাকে কক্ষপথে স্থান করে দেয়ে। এর উপর ভিত্তি করেই তিনি হিসাব করতে বসে যান যে, এই ধারণার ফলাফল কি হতে পারে।

প্রশ্ন এটি ছিলনা যে, অভিকর্ষ বল আদৌ আছে কি-না । বরং প্রশ্ন ছিল এই বলটি এতো দূরত্ব পর্যন্ত আপন প্রভাব প্রসারিত করতে পারে কি-না যাতে এমনকি চন্দ্রের উপরও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা যায়। নিউটন দেখান যে, এই বলটি যদি দূরত্বের বিপরীত বর্গীয় সূত্রানুসারে কমতে থাকে তাহলে চাঁদের কক্ষীয় পর্যায়ের যে মান পাওয়া যায় তা সামঞ্জস্যপূর্ণ । তিনি ধারণা করেন এই একই বল অন্যান্য সকল কক্ষীয় গতির জন্য দায়ী। আর তাই এর নাম দেন “সর্বজনীন মহাকর্ষ”।

উইলিয়াম স্টাকলি নামক অপর একজন সমসাময়িক লেখক তার “মেময়ের্‌স অফ স্যার আইজাক নিউটন্‌স লাইফ” নামক গ্রন্থে ১৭২৬ খ্রিস্টাব্দের ১৫ এপ্রিল কেনিংস্টনে নিউটনের সাথে তার একটি বাক্যালাপের বর্ণনা দেন। এই বাক্যালাপের এক পর্যায়ে নিউটন বলেন যে, “মহাকর্ষ নিয়ে তিনি আগে থেকেই চিন্তিত ছিলেন। এমন সময় বাগানে গবেষণার মুড নিয়ে বসে থাকার সময় গাছ থেকে একটি আপেল মাটিতে পতিত হয় । আপেলটি কেন সব সময় অভিলম্ব বরাবর মাটির দিকে পতিত হয়, তিনি নিজের মনে চিন্তা করেন। কেন পাশে বা উপর দিকে যায়না, সবসময়ই কেন পৃথিবীর কেন্দ্রের দিক বরাবর পতিত হয় ।” একই ধরনের বাক্যের সমাবেশে ভলতেয়ার তার “এসে অন এপিক পোয়েট্রি” (১৭২৭) নামক প্রবন্ধে লিখেছেন “আইজাক নিউটন যখন তার বাগানে হাটছিলেন. তখন গাছ থেকে একটি আপেলকে মাটিতে পড়তে দেখে প্রথম মহাকর্ষ পদ্ধতি সম্বন্ধে তার বোধদয় হয় ।” এই বর্ণনাগুলো সম্ভবত কিছুটা অতিরঞ্জিত । কারণ নিউটনের নিজের বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি উল্‌সথর্প ম্যানরে তার নিহের বাসার জানালার কাছে বসে ছিলেন । এমন সময় জানালা দিয়ে গাছ থেকে একটি আপেল মাটিতে পড়তে দেখেন ।

 

নিউটন যে গাছটির কথা বলেছেন তা চিহ্নিত করতে গিয়ে অনেকগুলো গাছকেই নির্বাচিত করা হয়েছে । গ্রান্থামের কিংস স্কুলের দাবী অনুসারে গাছটি স্কুল কর্তপক্ষ কিনে নিয়েছিল । কিনে নেয়ার পর গাছটি উপড়িয়ে ফেলে প্রধান শিক্ষকের বাগানে পুনরায় লাগানো হয় । বর্তমানে উল্‌সথর্প ম্যানরের দায়িত্বে থাকা ন্যাশনাল ট্রাস্ট এই দাবী মেনে নেয়নি। তাদের মতে ম্যানরের বাগানেই গাছটি রয়েছে। এই গাছের একটি বংশধর কেমব্রিজের ট্রিনিটি কলেজের প্রধান ফটকের পাশে বেড়ে উঠতে দেখা যায় । নিউটন ট্রিনিটি কলেজে অধ্যয়নকালে যে কক্ষে থাকতেন তার ঠিক নিচেই গাছটি অবস্থিত ।

 

·       সমালোচনা

বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং তার আ ব্রিফ হিস্টরি অফ টাইম গ্রন্থের পরিশিষ্টে নিউটনের একটি সংক্ষিপ্ত জীবনী সংযুক্ত করেছেন যাতে নিউটনের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে বেশ কিছু সমালোচনা প্রকাশিত হয়েছে । তার প্রিন্সিপিয়া বই প্রকাশিত হওয়ার পর নিউটন বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেন, রয়েল সোসাইটির সভাপতি নির্বাচিত হন এবং প্রথম বিজ্ঞানী হিসেবে নাইট উপাধি লাভ করেন । এর পরপরই নিউটনের সাথে দুইজন জ্যোতির্বিজ্ঞানী যারা তার প্রিন্সিপিয়া বই লিখার সময় তথ্য দিয়ে সাহায্য করেছিলেন তাদের সাথে সংঘর্ষ বাঁধে । এরা হলেন রয়েল এবং ফ্ল্যামস্টিড । সংঘর্ষের কারণ, নিউটন তাদের কাছ থেকে এমন কিছু তথ্য চেয়েছিলেন যা তারা দিতে সম্মত হন নি । নিউটন কোনো না সহ্য করতে পারতেন না । তিনি নিজেকে রয়েল মানমন্দিরের পরিচালনা পরিষদে অন্তর্ভুক্ত করে তার চাওয়া সেই ত থ্য-উপাত্তগুলোর অবিলম্বে প্রকাশের দাবী করেন। কিন্তু তিনি উপাত্তগুলো পান নি । এরই ধারাবাহিকতায় তিনি ফ্ল্যামস্টিডের গবেষণাকর্ম তার কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে এডমন্ড হ্যালির নামে প্রকাশের ব্যবস্থা করেন; অথচ হ্যালি ছিলেন ফ্ল্যামস্টিডের আজীবন শত্রু । সুবিচারের আশায় ফ্ল্যামস্টিড আদালতের আশ্রয় নেন এবং বিচারের পর তার কাছ থেকে চুরি করে নেওয়া গবেষণাকর্মের প্রকাশনা বণ্টনের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য নিউটন তার লেখা প্রিন্সিপিয়া বইয়ের পরবর্তী সংস্করণসমূহে ফ্ল্যামস্টিডের নামে উল্লেখিত সকল তথ্যসূত্র কেটে বাদ দিয়ে দেন ।

 

নিউটনের সাথে আরেকটি বড় ধরনের বিরোধ ছিল জার্মান দার্শনিক ও গণিতজ্ঞ গটফ্রিড লাইবনিৎসের। লাইবনিৎস এবং নিউটন সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে প্রায় একই সময়ে বিজ্ঞানের একটি নতুন শাখার উন্নয়ন ঘটান যা ক্যালকুলাস নামে পরিচিত। আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম ভিত্তি হচ্ছে এই শাখাটি । যদিও আমরা এখন জানি নিউটন লাইবনিজের কয়েক বছর পূর্বেই এটি আবিষ্কার করেছিলেন, তবে তিনি তা প্রকাশ করেছিলেন অনেক পরে অর্থাৎ ১৬৯৩ খ্রিস্টাব্দে; আর পূর্ণ বিবরণ প্রকাশ করেছিলেন ১৭০৪ খ্রিস্টাব্দে। অথচ লাইবনিজ তার কাজের একটি পূর্ণ বিবরণ ১৬৮৪ খ্রিস্টাব্দেই প্রকাশ করেছিলেন । মূলত লাইবনিজের ব্যবকলন পদ্ধতিই পরবর্তীকালে মহাদেশ জুড়ে গৃহীত হয়েছিল । কে আগে এটি আবিষ্কার করেছেন তা নিয়ে তৎকালীন বিজ্ঞানী সমাজের মাঝে প্রবল বিতর্কের সূত্রপাত ঘটে । দুজনের বিরুদ্ধে ও পক্ষেই অনেক লেখালেখি হয়। আশ্চর্যের বিষয়, নিউটনের পক্ষে লিখিত অধিকাংশ নিবন্ধই ছিল তার নিজের লেখা এবং তার বন্ধুদের নামে প্রকাশিত । বাগ্‌বিতণ্ডা চলতে থাকায় লাইবনিজ বিষয়টি রয়েল সোসাইটিতে উত্থাপন করেন । সোসাইটির সভাপতি নিউটন এর সঠিক অণুসন্ধানের জন্য তার বন্ধুদের নিয়ে একটি পক্ষপাতিত্বমূলক কমিটি গঠন করেন । এই কমিটি পূর্ণ ক্ষমতায় কাজ শুরু করে ১৭১১ খ্রিস্টাব্দে। রয়েল সোসাইটির প্রতিবেদনে লাইবনিজকে গবেষণা কর্ম চুরির দায়ে অভিযুক্ত করা হয়। এরপর নিউটন নাম গোপন করে এক সাময়িকীতে রয়েল সোসাইটির প্রতিবেদনের পক্ষেও লিখেছিলেন । লিবনিজের মৃত্যুর পর নিউটন বলেছিলেন. লাইবনিজের মন ভেঙ্গে দিয়ে তিনি খুব শান্তি পেয়েছেন । লিবনিজের সাথে যখন তার বিরোধ চলছিল তখনই নিউটন কেমব্রিজ ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন । বিজ্ঞানের জগৎ ছেড়ে তিনি ক্যাথলিক-বিরোধী রাজনীতি ও পরবর্তীকালে সংসদীয় কাজে যোগ দেন। একসময় রয়েল মিন্টের ওয়ার্ডেনের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হন। সেখান থেকে তিনি জাল-বিরোধী কর্মকাণ্ডকে জোরদার করে তুলেন। এর কারণে অনেককে প্রাণ দিতে হয়েছিল বলে স্টিফেন হকিং তার বইয়ে লিখেছেন ।

 

আইনস্টাইন


গত ১৮ ই এপ্রিল (১৯৫৫) আমেরিকার এক হাসপাতালে আইনস্টাইন পরলকগমন করেছেন । দেশে দেশে লোক তাঁর জন্যে শোক প্রকাশ করছে । আমাদের দেশের শিক্ষিত জনসাধারন , যাঁরা বিজ্ঞানের বিশেষ খবর রাখেন না, তাঁরাও ভাবছেন পৃথিবী সত্যিকারের একজন মহাপুরুষকে হারালো । তাঁর জন্ম ১৮৭৯ সালে দক্ষিন জার্মানির এক ইহুদি পরিবারে । বাবা ছিলেন ছোট কারবারি । মিউনিকের স্কুলে কিছুদিন পড়বার পর অল্প বয়সেই ইটালিতে চলে আসতে হয়েছিল । শেষ অবধি চলে আসেন সুইজারল্যান্ডে । জুরিখের ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে পাশ করবার পর বাইশ বছর বয়সে বার্নের পেটেন্ট অফিসে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয় ।

কিশোর বয়সের কিছু কিছু কথা আইনস্টাইন নিজেই লিখে গেছেন । বরাবরই তিনি সাধারন থেকে কিছু ভিন্ন প্রকৃতির মানুষ । যে উন্নতির দুরাশা মানুষকে সারাজীবন অস্থির করে, মাতিয়ে রাখে, তার অসারতা কিশোর বয়সেই তাঁর মনে পরিস্কার ভাবে ফুটে উঠেছিল । পেট বড় বালাই, এর জন্য সকলকেই নেচে বেড়াতে হয় । কিন্তু পেট ভরলেই যে মন ভরে না, এ সত্য তাঁর কাছে অল্পবয়সেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল । তাই অল্পবয়েসেই প্রথমে তাঁর মন ঝুঁকেছিল ধর্মের দিকে । হঠাৎ বারো বছর বয়সে বিজ্ঞানের চলতি বই পড়ে তাঁর মনে হল, বাইবেলের কথা ও গল্প কখনও সত্য হতে পারে না । হঠাৎ মন বেঁকে বসল; সম্পূর্ণ নতুন পথে স্বাধীন চিন্তার দৌরাত্ম্যে মনে হল ইচ্ছা করেই সমাজ চিরদিন মানুষের মন ভোলাবার জন্যে মিথ্যা প্রচার করে আসছে । সেই থেকে আপ্তবাক্যে অবিশ্বাস তাঁর মজ্জাগত হয়ে উঠল; কোন ক্ষেত্রেই কোন চিরাচরিত মতামত বিচার না করে সহজে তিনি গ্রহণ করতে পারেন নি।

অল্পবয়েসেই ধর্মের দিকে যে মন ঝুঁকেছিল, সে হয়ত নিজের একান্ত ছোট গণ্ডী থেকে নিজেকে মুক্ত করবার প্রথম প্রয়াস । তাঁর মন শুধু নিজের ছোট কথা নিয়েই থাকতে চাইছিল না । তাই বহির্জগতের আকর্ষণ তাঁর কাছে মুক্তির ডাক বলে মনে হল। পরিণত বয়সে তিনি লিখেছেন — “বাহিরে প্রকাণ্ড জগত— সম্পূর্ণভাবে মানুষের নিরপেক্ষতার অস্তিত্ব — তবু এই রহস্যের কতকটা হয়ত আংশিকভাবে মানুষ পরীক্ষা ও চিন্তা করে বুঝতে পারে । দেখলাম বহু শ্রদ্ধাভাজন সারা জীবন এই কাজে নিজেকে উৎসর্গ করে জীবনে মুক্তি ও নিরাপত্তা এনেছেন । বুদ্ধির দ্বারা জগতকে যতটুকু পাওয়া সম্ভব তার প্রয়াসই জীবনের শ্রেষ্ঠ কাম্য । বলে মনে হল । অতীতে বহু লোকই এই কাজে নিজেকে উৎসর্গ করেছেন— বর্তমানেও এই কাজে নিজেকে নিয়োগ করেছেন বহুলোক । তাঁদের অর্জিত জ্ঞান আত্মার এই সাধনার নিত্য সহায় হবে । এই সাধনার পথ হয়ত ধর্মমার্গের মতো চিত্তাকর্শক কিংবা সুখপ্রদ নয় ,তবু কখনও বিশ্বাস হারাই নি, এই পথের পথিক হয়েছি বলে একবারও অনুশোচনা করতে হয় নি ।”

পাঠ্যাবস্থায় আইনস্টাইন জুরিখের কলেজ ল্যাবরেটরিতেই বেশী সময় কাটাতেন । তিনি সরাসরি পরীক্ষার একটা মস্ত আকর্ষণ অনুভব করতেন । পদার্থ-বিজ্ঞানের যে —সব সমস্যার কথা তাঁর মনে অল্পবয়সেই ফুটে উঠেছিল তার উত্তর খুঁজতেন ঘরে বসে হেলম্‌হোল্ট্‌স, কিরশফ্‌ ও হার্ট্‌স্‌–এর বই পড়ে । বহু মনীষী সেই সময় জুরিখে অধ্যাপনা করতেন, তবু তাঁদের কাছ থেকে নিজের সমস্যাগুলির সমাধানে কোন সাহায্য পেয়েছিলেন বলে মনে হয় না । বরং কলেজের শিক্ষা পদ্ধতি, নিয়মের গণ্ডি, বহু পরীক্ষার আনুগত্য তাঁর কাছে প্রকৃত শিক্ষার অন্তরায় বলে মনে হত । এতে ছাত্রদের মন থেকে জানবার উৎসাহ যে একেবারে মুছে যায় না, সেইটেই তিনি আশ্চর্যের কথা মনে করতেন । তিনি লিখেছেন—“সুখী ক্ষীণজীবী উদ্ভিদের মতো ছাত্রদের মনে এই অনুসন্ধিৎসা বৃত্তিকে লালন করতে হয় । সযত্নে উদ্দীপনা জাগ্রত করবার চেষ্টা তো আছেই, কিন্তু বিশেষ করে দরকার বাঁধাধরা নিয়মের পাশ থেকে মুক্তি । পক্ষান্তরে, জোর করে দায়িত্বের ভার চাপিয়ে অনুসন্ধানের আনন্দ মনে ফুটিয়ে তোলা যাবে কিংবা জ্ঞানচক্ষু উন্মীলন করা যাবে, এটা ভাবা মস্ত ভুল । চাবুক হাতে জোর করে অনবরত খাওয়ানোর চেষ্টা করলে শিকারী বন্য জন্তুরও অবশেষে খাদ্যে অরুচি জন্মানো অসম্ভব নয় ।” এই ভাবেই কলেজের চার বছর নির্দিষ্ট পাঠ্যতালিকার মধ্যে আবদ্ধ না থেকে তাঁর সতেজ প্রতিভা নিজের মনের খোরাক সংগ্রহ করে নিয়েছিল নিজের চেষ্টায় ।

এই সময় থেকে Thermodynamics এর উপর শ্রদ্ধা তাঁর মনে বদ্ধমূল হয়েছিল। বহু বছর ধরে নানাভাবে বিজ্ঞানের মূল সূত্রগুলির উপর নানা গবেষণা চালিয়ে তিনি শেষ বয়সে বলে গেছেন যে, এর বিশেষ রীতি ও মূলসূত্রগুলি পদার্থবিজ্ঞানে চিরকাল অপরিবর্তিত অবস্থায় থেকে যাবে।

গতি —বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে তখন নানারকম তর্কবিতর্ক চলছিল । এই সময়ে বিজ্ঞানীরা নানাভাবে এই দ্বন্দ্বের সমন্বয় করবার চেষ্টা করছিলেন । ম্যাক্সওয়েলের অনুসরণে আলোক–তরঙ্গের পরিব্যাপ্তির কারণ খুঁজতে গেলে যে নিউটনীয় গতিবিজ্ঞানের মূল সূত্রগুলির সঙ্গে বিরোধের সম্মুখীন হতে হয়, এটা তাঁর জানা ছিল বহুদিন থেকে ।

সকলেই এ দ্বন্দ্বের সমন্বয়ের উপায় খুঁজতে লাগলেন । ম্যাক্সওয়েলের নির্দেশিত পথে লোরেঞ্জ এগিয়ে গেলেন । পরীক্ষার ফলে সব জড়ের মধ্যে বিদ্যুতকণার অস্তিত্ব ততদিনে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে । বিদ্যুতের অবস্থান ও বিশেষ করে ইলেকট্রনের গতি বৈচিত্র্য ও সমাবেশের ফল হিসাবে জড়ের মধ্যে বিশেষ বিশেষ ধর্মের প্রকাশ সম্ভব, এই ছিল লোরেঞ্জের প্রতিপাদ্য । এতে এভাবে দেখলে আলোক-তরঙ্গের ওপর  বস্তুর গতির কি প্রভাব থাকতে পারে তাই খুঁজতে লাগলেন লোরেঞ্জ এবং ১৯০৫ সালে যে প্রবন্ধ প্রকাশ করলেন, এই বিষয়ে তাতে সম্পূর্ণ কৃতকার্য তার পূর্বাভাস ছিল । এই সময়ে আইনস্টাইন তাঁর আপেক্ষিকবাদের প্রবন্ধ প্রকাশ করেন । পেটেন্ট অফিসে কাজ করেন পেটের দায়ে । গবেষক হিসাবে তখন সম্পূর্ণভকাবে অজ্ঞাতকুলশীল ।

এখান থেকেই সম্পূর্ন নতুন ধরনের কথা তিনি বিজ্ঞান জগতে প্রচার করেন । বিরোধের কারণ দেখালেন বিশেষ করে নিউটনীয় গণিতে কালের পরিকল্পনায় । দর্শকের গতিনিরপেক্ষ এই কাল যে বৈজ্ঞানিক জগতে অচল— এটি আপেক্ষিকবাদের মূল কথা । প্রতি দর্শককেই তাঁর জগতের মাপজোখের ব্যবস্থা করতে হয় । প্রকৃতিক ঘটনা গুলির মধ্যে কার্যকারণের শৃঙ্খলা খুঁজতে গেলে কোথায় ঘটেছে কোন বিশেষ ঘটনা এবং কখন সেটি ঘটল— এই দুয়েরই খবর রাখতে হয় । ব্যবধানের হিসেব হয় মাপকাঠির গুণে । ইউক্লিডিয় জ্যামিতির মূলসূত্রগুলি অনুসারে এবং সময়ের মাপও করতে হবে ঘড়ির কল্পনা করে । প্রথম থেকে ধরে নিলে চলবে না যে, এই মাপজোখের কাল একই এবং দর্শকের গতি নিরপেক্ষ । বরং বুঝতে হবে যে, কালের পরিমাপের সম্ভাবনার মধ্যে প্রছন্ন আছে যে মূলনীতি, সেটি হচ্ছে আলোকের দর্শক— নিরপেক্ষ অপরিবর্তিত বেগ । মাত্র এরই আশ্রয়ে প্রতি দর্শকের যে নিজস্ব কালের পরিকল্পনা সম্ভব তা আমরা অবিসম্বাদী রুপে দেখাতে পারি । পরিমিত কালের এই কল্পনার সঙ্গে নিউটনীয় গণিতের সাক্ষাত বিরোধ আছে । আইনস্টাইনের অনুসরণে দেশ ও কালের পরিমাণের মধ্যে যে দর্শকের নিজের গতির প্রভাব প্রছন্নভাবে থাকে তা সকল বিজ্ঞানীরা স্বীকার করেন ।  প্রকৃতির নিয়মাবলীর মূলসূত্র যে এইভাবে শুদ্ধচিন্তা পথে আবিষ্কৃত হওয়া সম্ভব, আইনস্টাইনের আবিস্কার তার উজ্জল দৃষ্টান্ত ।

বৈজ্ঞানিক গবেষনার মধ্যে সরাসরি পরীক্ষার স্থান যে অতি উচ্চে তা তিনি কোনো কালেই অস্বীকার করেননি । বাহ্যপ্রকৃতির সঙ্গে ওই প্রনালীতে মানুষের পরিচয় হয় । তবে অবিছিন্ন অভিজ্ঞতাকে নিয়মসূত্রে গেঁথে মানুষ যে বিজ্ঞান সম্ভব করেছে, যার ফলে মনে হয় জড়ের আদিম রহস্য সে কত কষ্টে বুঝতে পেরেছে— সেই নিয়মের আবিষ্কারের পথে পথ প্রদর্শক, বিশেষ করে মানুষের মন । একাগ্র চিন্তা ও গণিতের সুষমিত নিয়মাবলীর মধ্যে দিয়ে আমাদের মূলনীতি গুলি অনুসরণ করতে হবে । আইনস্টাইন সারাজীবন এই নীতি মেনে গবেষণা চালিয়ে গেছেন ।

১৯০৫ সাল আইনস্টাইনের জীবনে এক স্মরনীয় বছর । এই একসালেই তিনি পদার্থ-বিজ্ঞানের তিনটি বিশেষ ক্ষেত্রে তাঁর অসাধারন চিন্তার যে আলোকপাত করেছেন এবং যে মূলসূত্রগুলির আবিস্কার করেছেন তা বিজ্ঞানের ইতিহাসে অবিনশ্বর হয়ে থাকবে । Thermodinamics-এর নীতি অনুসারে ব্রাউনিয়ান মুভমেণ্ট-এর গণনা করেছিলেন— তার উপর নির্ভর করে পেঁরা অনু-পরমাণুর অস্তিত্বকে কল্পনার স্তর থেকে পরীক্ষিত সত্যের পর্যায়ে এনেছিলেন । প্ল্যাঙ্ক যে মূলসূত্রের সন্ধান পেয়েছিলেন (১৯০০), তাঁর মধ্যে জড় ও বিকিরণের শক্তির আদান-প্রদানের বৈচিত্র্য তাঁকে বিহ্বল করেছিল ।  বিকিরণকে নিছক তরঙ্গ হিসাবে ভাবলে সেইরূপ আদান-প্রদানের হেতু খুঁজে পাওয়া যায় না । এইবার বিজ্ঞান জগতে আর এক বিপ্লব উপস্থিত করলেন আইনস্টাইন । তিনি প্রচার করলেন শক্তির কণাবাদ— জড়ের উপর আলোক-তরঙ্গের প্রতিক্রিয়ার মধ্যে তার অস্তিত্ব প্রমাণ করবার চেষ্টা করলেন । চিরাগত গতিবিজ্ঞান ও ম্যাক্সওয়েলের রীতি পরিত্যাগ করে থার্মোডাইনামিক্সের নব সূত্রানুযায়ী তিনি বুঝতে চেষ্টা করলেন এই প্রক্রিয়া । বিজ্ঞানের এই ক্ষেত্রে অনেক নতুন সন্ধান দিলেন তিনি ।

বিচিত্র রীতিতে নিছক একাগ্র সাধনার ফলে, যে সব সত্যের তিনি সন্ধান দিয়েছেন তা বিজ্ঞানের অগ্রগতির সাহায্য করেছে প্রচুর । তাঁরই শক্তি-কণাবাদ বোরের কল্পনার ভিত্তি স্বরূপ হয়ে রয়েছে । জড়ের শক্তি বিকিরণ ও বিশ্লেষন— এই দুই ব্যাপার বুঝতেই আইনস্টাইনের শক্তি-কণার আশ্রয় নিতে হয় ।

আপেক্ষিকবাদের পরিকল্পনায় সাহায্যে গতি ও আলোক— বিজ্ঞানের বিরোধের সমন্বয় করে তিনি ক্ষান্ত থাকেননি— জড়ের মহাকর্ষনের রহস্য তিনি এভাবেই বুঝতে চেষ্টা করেছেন । প্রথম যুগের আপেক্ষিকবাদের পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করে তা ১৯১৫ সালে সম্ভবপর হল । তার সঙ্গে সঙ্গে বহুকালের প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক বিশ্বাসের উপর তিনি ঘা দিলেন । তিনি শুধু যে কালের আপেক্ষিকতা প্রচার করলেন তা নয়, সঙ্গে সঙ্গে ইউক্লিডের জ্যামিতির উপর প্রতিষ্ঠিত দেশ বর্ণনারও যে পরিবর্তন দরকার তা তিনি সকলকে বোঝালেন ।

আজকের দিনে যেসব জ্যোতির্বিদেরা ব্রহ্মাণ্ডের বিপূল বিস্তার ও বিভিন্ন নীহারিকার উৎপত্তির বিষয় জল্পনা-কল্পনা করেন তাঁদের সকলকে আইনস্টাইনই পথ দেখিয়েছেন ।

নিউটনীয় গণিতের মূলনীতির সংশোধনের চেষ্টা করবার সময় আইনস্টাইন আরেকটি মূলসূত্রের সন্ধান পেলেন । আইনস্টাইনের হিসেবে কোনো বস্তুকণারই ভরসংখ্যা নিত্য থাকবার কথা নয় । এই কথাটি নিউটনের মতের সোজাসুজি পরিপন্থী এবং গতিবর্ধন ও শক্তি আহরণের ফলে প্রত্যেক বস্তুকণারই ভরসংখ্যা বেড়ে যেতে থাকবে, এই সত্য আইনস্টাইন প্রমান করেন । তার মানে, ঐ ভরসংখ্যা নির্দেশ দিচ্ছে— ঐ কণার মধ্যে কি প্রভুত শক্তি প্রচ্ছন্ন আছে । আণবিক বোমার যুগে এই যুক্তি বারবার পরীক্ষিত হয়েছে এবং বর্তমানে নিউক্লিয়ার গবেষকের সর্বগ্রাহ্য পরীক্ষিত সূত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে এই মতবাদ ।

১৯০৫ সালের পর বিদ্বজ্জন মহলে তাঁর সুনাম ছড়িয়ে পড়ল । পেটেন্ট অফিস থেকে তাঁকে অধ্যাপনার কাজে নামতে হল । জুরিখ, প্রাগ ঘুরে তিনি শেষে প্রথম মহাযুদ্ধের অব্যবহিত পূর্বে বার্লিনের গবেষক ও অধ্যাপক নিযুক্ত হয়ে রইলেন । এতদিনে তাঁর প্রচুর কাজের মধ্যে কিছু অবসর মিলল । নিছক চিন্তার পথে তিনি ভিন্ন ভিন্ন সত্যের উদঘাটনে তৎপর হয়ে উঠলেন ।

অবশ্য শেষ অবধি বার্লিনে তিনি নিশ্চিন্ত হয়ে থাকতে পারেননি । জাতি-বিদ্বেষের যে আগুন জ্বলে উঠেছিল তার ফলে ১৯৩৩ সালে তাঁকে জার্মানি ছাড়তে হয় । শেষ জীবনে তিনি আমেরিকায় কাটান । সেইখানেই শেষ অবধি একই চিন্তাধারা তাঁকে ব্যাপৃত রেখেছিল । তিনি বারবার বলেছেন যে, পূর্ণ সত্যের সন্ধান এখনও মেলেনি তাঁর আপেক্ষিকবাদে । অনেক কিছু জানা সম্ভব— তা শুধু পরীক্ষার ফলে হবে না । কঠোর সাধনা ও চিন্তা তাই তিনি নিয়োগ করেছিলেন এই কাজে । এইভাবেই বিশুদ্ধ সত্যের সাধনা করতে করতে তিনি মৃত্যু বরন করেছিলেন ।

মানুষ হিসাবে তাঁর ব্যক্তিত্ব ছিল অসাধারণ । অত্যাচার কিংবা অসত্যের কাছে কখনও মাথা নত করেন নি। মানুষের উপর বিশ্বাস ছিল তাঁর অপরিসীম। নিজে অনেক অবহেলা সহ্য করেছিলেন— তাই বিজ্ঞানের নবীন ব্রতীদের তিনি স্নেহ করতেন।

বিজ্ঞানব্রতীদের অনেক সভাতেই তাঁকে দেখা যেত। নতুন মতবাদ, যার মধ্যে সত্য নিহিত আছে বলে তিনি বিশ্বাস করতেন, তাকে তিনি খোলাখুলি সাহায্য ও প্রশ্রয় দিয়েছেন।

অনেক গবেষকের মতবাদের উপর তাঁর প্রতিভার আলোক ফেলে সমালোচনা কঠোর পরীক্ষার মধ্যে দিয়ে সত্য সন্ধানী দর্শকদের ঠিক পথে চলতে উদ্বুদ্ধ করেছেন।

বার্লিন ছাড়তে হল অত্যাচারের খোলাখুলি প্রতিবাদ করেছিলেন বলে। কি হিটলার, কি মুসোলিনী, এই একনায়কদের কারো কাছে তিনি মাথা নত করেন নি । শেষ জীবনে যখন আমেরিকা তাঁর প্রদর্শিত পথে এগিয়ে আনবিক শক্তির সন্ধান পেল এবং তা মানুষের সংহার কার্যে ব্যবহার করল, তখন তার বিরুদ্ধে খোলাখুলি প্রতিবাদ জানাতে তিনি পশ্চাৎপদ হন নি।

সর্বক্ষেত্রে তাঁর মতামতের একটা অভিনবত্ব ছিল। তুচ্ছ আত্মগরিমা কিংবা নিজের আর্থিক প্রতিষ্ঠার জন্যে তিনি কখনও ব্যগ্র ছিলেন না—অনেক সময় অনেক কথা হয়ত সকলের মনঃপূত হত না, তবু সকলেই জানত তিনি কোন ব্যক্তিগত কোণ থেকে সমালোচনা বা প্রচার করছেন না।

আজ তিনি চলে গেছেন। তাঁর দান জগতে চিরস্মরনীয় হয়ে থাকবে, আর থাকবে তাঁর কীর্তি—নিছক সাধনা ও একাগ্রতায় মানুষ কি করতে পারে তার জাজ্বল্যমান নিদর্শন।

  —জ্ঞান ও বিজ্ঞান, এপ্রিল, ১৯৫৫

 

 ( ক্রমশ )

 


Comments

Post a Comment