The Wailing Well [Ghost]

 

কুয়ো


মন্টেগু রোডস্‌ জেমস (এম. আর. জেমস)


সটীক অনুবাদ ঃ দেবজ্যোতি বল্লভ




সালটা ছিল ’১৯ । একটি বিখ্যাত স্কুলের বালক-বাহিনির দুই সদস্য ছিল আর্থার উইলকক্স আর স্ট্যানলি জাডকিন্স্‌ । তারা সমবয়সী, একই বোর্ডিং এ থাকত, এক শ্রেনিতে পড়ত ফলে স্বভাবতই তারা একই পাহারা-দলেরও সদস্য ছিল । বাহ্যিক হাবভাবে তারা এতটাই একরকম যে সেটা তাদের সংস্পর্ষে আসা শিক্ষকদের প্রায়ই উদ্বেগ, অশান্তি এমনকি জ্বালাতনেরও কারণ হত । কিন্তু ভিতরের মানুষটি (বা বালকটি) কতই না আলাদা!

আর্থার উইলকক্স ঘরে ঢুকতেই হেডমাষ্টার সহাস্যে বললেন— ‘উইলকক্স, আর বেশিদিন তুমি এখানে থাকলে এবার প্রাইজ ফান্ডে যে ঘাটতি পড়বে ! এই যে, এই নাও সুন্দর বাঁধাই করা “বিশপ কেনের জীবন ও বাণী” আর সেইসঙ্গে তুমি আর তোমার পরিবার আমার আভিনন্দন নিও’ । খেলার মাঠের পাশ দিয়ে যাবার সময় এই উইলকক্সকে দেখেই প্রোভোস্ট মশাই ভাইস-প্রোভোস্টকে বললেন, ‘ছেলের ললাট ভারি প্রশস্ত !’, ‘হ্যাঁ, ঠিকই বলেছেন’, বললেন ভাইস-প্রোভোস্ট । ‘এর অর্থ হয় সে জিনিয়াস না হয় ব্রেনে জল জমেছে ।

স্কাউট হিসাবে উইলকক্স সব প্রতিযোগীতাতেই ব্যাজ জিতে জয়ের শিরোপা পেয়েছে । রান্না করার ব্যাজ, মানচিত্র তৈরির ব্যাজ, জীবন রক্ষকের ব্যাজ, ছেঁড়া খবরের কাগজ কুড়োনোর ব্যাজ, ছেলেদের ঘর থেকে বেরবার সময় জোরে দরজা বন্ধ না করার ব্যাজ ও আরও অন্যান্য । এই জীবন রক্ষকের ব্যাজ সম্বন্ধে স্ট্যানলি জাডকিন্স্‌ এর বেলায় আমার কয়েক কথা বলার আছে ।

আপনি শুনে অবাক হবেন না যে, মি. হোপ জোন্স্‌ এই আর্থার উইলকক্সের প্রশংসা করে তার গানে কয়েক কলি যোগ করেছিলেন । আর সমগ্র তৃতীয় ফর্মের সর্বসম্মতিক্রমে নীচের মাষ্টার ভাল আচরণের মেডেলের সুন্দর লাল বাক্স হাতে তুলে দিতে গিয়ে কেঁদে ভাসিয়েছিলেন ।  

সর্বসম্মতিক্রমে বলাটা বোধহয় ভুল হল । অমত ছিল একজনেরই, সে হল জাডকিন্সের ভাই । তার মতে এমনটা করার পেছনে যথেষ্ট কারন রয়েছে । মনে হত সে যেন তার বড়ভাইয়ের সঙ্গে ঘর ভাগ করে রয়েছে ।

   আপনি নিশ্চই এবারেও বিস্মিত হবেন না জেনে যে, পরবর্তী বছরে আর্থার উইলকক্সই প্রথম হল এবং সেই একমাত্র ছেলে যে কিনা স্কুল ও ওপিডান্সের যুগ্ম ক্যাপ্টেন নির্বাচিত হল । এই দুই পদের দ্বায়িত্বের চাপ সেইসঙ্গে সাধারন স্কুলের কাজ সব মিলেমিশে এতই দুর্বিসহ হয়ে উঠল যে পারিবারিক ডাক্তার তাকে ছ-মাস সম্পূর্ণ বিশ্রাম অতঃপর বিদেশ ভ্রমণের কড়া নির্দেশ শুনিয়ে দিলেন ।

তার এই কৌতুকপূর্ণ বিশিষ্টতা অর্জনের পদাঙ্ক অনুসরণ বড়ই মনোরম । কিন্তু আর্থার উইলকক্সকে নিয়ে যথেষ্ট হয়েছে, সময় কম, আমরা বরং চলে যাই সম্পূর্ণ এক ভিন্ন বিষয়ে: স্ট্যানলি জাডকিন্সের অর্থাৎ জাডকিন্স দি মেজর এর কাণ্ডকারখানা ।

স্ট্যানলি জাডকিন্স্‌ও আর্থার উইলকক্সের মত কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল, কিন্তু সম্পূর্ণ অন্যভাবে । একেই একবার নীচের মাষ্টার ব্যাজার মুখে বলেছিলেন, ‘আবার কি করেছ জাডকিন্স্‌? এভাবে আর কিছুদিন চলতে থাকলে কিন্তু এই একাডেমিতে এককালে ছিলে বলে পরে আপসোশ করতে হবে । সাপের পাঁচ-পা দেখে ভাবছ প্রতিবার বরাত জোড়ে রেহাই পেয়ে যাবে !’

এই জাডকিন্স্‌কেই প্রোভোস্ট মশায় খেলার মাঠের পাশ দিয়ে যাবার সময় দেখতে পান, আর ঠিক তখনি একটা ক্রিকেট বল বেশ জোড়ে এসে লাগল তার গোড়ালিতে । কাছেই শোনা গেল, ‘ধন্যবাদ, ওভার শেষ!’ । ‘আমার মনে হয়,’ একটু থেমে গোড়ালিতে হাত বুলোতে বুলোতে বললেন প্রোভোস্ট, ‘ওই ছোকরার নিজে এসে বলটা নিয়ে যাওয়া উচিত’। ‘হ্যাঁ, নিশ্চই,’ বললে ভাইস-প্রোভোস্ট মশাই, ‘আর সে যদি বাগে আসে তবে আমি তাকে দিয়ে অন্য কিছু আনাতে চেষ্টা করব’ ।

স্কাউট হিসেবে স্ট্যানলি জাডকিন্স্‌ কোনো ব্যাজ পায়নি, শুধুমাত্র দলের অন্যদের থেকে ছিনিয়ে আনা ব্যাজগুলো ছাড়া । রান্না প্রতিযোগীতায় তাকে পাশের প্রতিযোগীর উনুনে পটকা ছুঁড়ে দিতে দেখা গেছে । সেলাই প্রতিযোগীতায় সে দুটো ছেলেকে একসঙ্গে বেশ মজবুত করে সেলাই করে দিতে সক্ষম হয়েছিল । ফলে তারা ওঠার সময় একটা কেলেঙ্কারি কাণ্ড ঘটেছিল । পরিচ্ছন্নতার ব্যাজ এর ক্ষেত্রে তাকে বাতিল করা হয়। কারণ গ্রীষ্মের মাঝামাঝি স্কুলের সময় গরম হবে বলে সে কালিতে আঙুল ডুবিয়ে বসে থাকতেও বাদ রাখেনি, একটু ঠাণ্ডা হবার জন্য । এছাড়াও একটা কাগজ যদি তুলতো তো কমসেকম ছটা কলার খোসা বা কমলালেবুর খোসা ফেলে আসত । তাকে আসতে দেখে বয়স্কা মহিলারা চোখের জলে অনুরোধ জানাত তাদের কলসি রাস্তার ওপারে না নিয়ে যেতে । কারণ এর অবসম্ভাবী ফলটি তারা ভালোমতই জানত। কিন্তু তার সবচেয়ে ন্যাক্কারজনক কাজটির নমুনা ছিল জীবন রক্ষার প্রতিযোগিতা, যার ফল হয়েছিল সুদূরপ্রসারী । মহড়ার সময়, যেমনটা হয় আরকি, লাগসই চেহারার নিচু ক্লাসের একটি ছেলেকে বেছে নিয়ে ধরাচুড়ো পড়া অবস্থায় হাত পা বেঁধে কুক্‌কুর(Cuckoo) বিলের সবচেয়ে গভীর অংশে ফেলে দেওয়া হত, এবং সময়ে সময়ে স্কাউটদের যার যার পালা আসত, তারা গিয়ে উদ্ধার করত । প্রতিবারই স্ট্যানলি জাডকিন্সের পালা আসলে, গুরুতর মুহূর্তে সে ফিটগ্রস্ত হয়ে মাটিতে গড়াগড়ি দিত আর ভয়ঙ্কর চিৎকার জুড়ত । এতে স্বাভাবিকভাবেই  উপস্থিত সকলের মনযোগ জলে পড়ে থাকা ছেলেটির থেকে সড়ে যেত, ফলে আর্থার উইলকক্স সে জায়গায় উপস্থিত না থাকলে ভারী মাসুল দিতে হত।


এর দরুন নীচের মাষ্টার কঠোরভাবে ওইখানেই প্রতিযোগীতার ইতি টানতে বাধ্য হলেন । বৃথাই মি. বিশলি রবিনসন্ তখন‌ গলা ফাটিয়ে ছিলেন  পাঁচটি প্রতিযোগীতায় মাত্র চারজন নিচু ক্লাসের ছেলে আসলে মারা গেছে । এতে নীচের মাষ্টার বলেন স্কাউটদের কাজে হস্তক্ষেপ করার অভিপ্রায় তার নেই; কিন্তু ওদের মধ্যে তিনজনই তার গায়কদলের মূল্যবান সদস্য ছিল । এই লোকসানের মাত্রা প্রতিযোগীতার সুফলের থেকে এতই বেশি যে তিনি এবং ড. লে খুবই অসুবিধায় পড়েছেন । পাশাপাশি ছেলেদের বাপ-মায়ের সাথে পত্রবিনিময় ইদানিং বিরক্তিকর এমনকি পীড়াদায়ক হয়ে দাঁড়িয়েছে । নিয়ম মাফিক পাঠানো ছাপানো ফর্মে তারা আর সন্তুষ্ট নয়, একাধিকবার তারা কার্যত ইটনে১০ ঢুঁ মেরে গেছে এবং নালিশ করে করে তাঁর মূল্যবান সময় নষ্ট করেছে। তাই জীবন রক্ষার প্রতিযোগিতা বর্তমানে অতীতের পাতায় ।

সংক্ষেপে, স্ট্যানলি জাডকিন্স্‌ স্কাউট হিসেবে কোনো কৃতিত্ব পায়নি, এবং একাধিক ক্ষেত্রে কথা ওঠে তাকে অবহিত করার যে, তার সাহায্যের আর প্রয়োজন নেই । এই ব্যাপারটা মি. ল্যাম্বার্ট দৃঢ়ভাবে সমর্থন করেন, কিন্তু শেষমেশ হাল্কা পরামর্শে ঠিক হয় তাকে আরেকটি সু্যোগ দেওয়া হবে ।

 

তাই গ্রীষ্মের মাঝামাঝি ছুটির দিনগুলিতে আমরা তাকে খুঁজে পাই অমুক১১ দেশের অমুক জেলার স্কাউটদের ক্যাম্পে ।


সকালটা ভারী সুন্দর । স্ট্যানলি জাডকিন্স্‌ আর তার কয়েকজন বন্ধু —যদিও এখনো তার বন্ধু-বান্ধব ছিল—নীচে চুড়োটায় রোদ পোহাচ্ছিল । স্ট্যানলি পেটের ওপর শুয়ে চিবুকে হাত রেখে দূরে তাকিয়েছিলো ।

‘ভাবছি ওই জায়গাটা কিরকম,’ সে বলল ।

‘কোন্‌ জায়গাটা ?,’ আরেকজন জিজ্ঞেস করল।

‘ওই যে মাঠের মাঝখানে ঝোপ মত জায়গাটা ।’



‘ওহ, তা আমি কি করে জানব বাপু ওটা কি ?’

‘কিজন্য জানতে চাইছিস্‌ বল্‌ত ?’—আরেকজন বলল ।



‘আমি জানি না, আমার ওটা ভালো লেগেছে। ওটাকে কি বলে ? কারও কাছে একটা ম্যাপ নেই ?’— বলল স্ট্যানলি, ‘আর তোরা নিজেদের স্কাউট বলিস !’

‘এই যে তোমার ম্যাপ হলো !’— বললে করিতকর্মা উইলফ্রেড পিপ্সক্যুয়েক, ‘আর এই তোমার জায়গা, দাগানো রয়েছে । কিন্তু ওটা লাল গণ্ডির ভিতরে। যাওয়া যাবে না ।’

‘লাল গণ্ডির কে তোয়াক্কা করছে ?’—বলল স্ট্যানলি, ‘কিন্তু তোর ওই যাচ্ছেতাই ম্যাপে তো এটার কোনো নামই নেই ।’

‘আচ্ছা, অত আগ্রহী হলে, ওই বুড়োটাকে জিজ্ঞেস কর না।’  ‘ওই বুড়োটা’ আসলে একজন বৃদ্ধ মেষপালক, যে উঠে এসে ওদের পিছনে দাঁড়িয়েছিল।



‘সুপ্রভাত, বাবুরা’,—সে বলল, ‘তোমাদের কাজের জন্য কেমন চমৎকার দিনখানা পেয়েছ, তাই না?’

‘হ্যাঁ, ধন্যবাদ,’—দিশি বিনয়ে বলল অ্যালজার্নন্‌ ডি মন্টমোরেন্সি, ‘আপনি কি বলতে পারেন ওই সেথায় ঝোপ মত জায়গাটাকে কি বলে?’

‘কেন পারব না’, বলল মেষপালক । ‘ওটা কাঁদুনে কুয়ো যে । তবে তা নিয়ে তোমাদের চিন্তার কোনো কারণ নেই ।’

‘ওখানে কি একটা কুয়ো আছে?’, বললে অ্যালজার্নন । ‘কে ব্যবহার করে ?’

মেষপালক হাসলো। ‘ভগবান তোমার মঙ্গল করুন’, সে বলল, ‘এই চত্তরের মানুষ থেকে ভেড়া কেউই ও কুয়ো ব্যাভার করে না; আমি যদ্দিন আছি কাউকে করতে দেখিওনি ।’  

 



‘বটে, তাহলে আজ সে রেকর্ড ভাঙবে,’ বলল স্ট্যানলি জাডকিন্স্‌, ‘কারণ আমি সেখানে গিয়ে চায়ের জন্য কিছুটা জল নিয়ে আসব !’

‘দোহাই তোমাদের বাবুরা !’, — সচকিত স্বরে বলল মেষপালক,  ‘অমন অলুক্ষুনে কথা বোলো না ! কেন, তোমাদের মাষ্টাররা সেথায় যেতে মানা করে নোটিশ দেননি? তাদের করা উচিত ছিল ।’

‘হ্যাঁ, তা দিয়েছে,’—বলল উইলফ্রেড পিপ্সক্যুয়েক।

‘চুপ কর গাধা !’ বলল স্ট্যানলি জাডকিন্স্‌। ‘আসল ব্যাপারটা কি? জল ভালো নয়? তা সে ফুটিয়ে নিলেই ঠিক হয়ে যাবে ।’

‘জল ভাল কি মন্দ তা আমি জানি না বাপু,’ মেষপালক বলল, ‘আমি শুধু জানি যে আমার বুড়ো কুকুরটা—আমাকে বা অন্য কাউকে ছেড়ে দাও— সেও ও মাঠের ধার মাড়ায় না।’

‘আরও বোকা বোকা’, রাগতভাবে বলল স্ট্যানলি জাডকিন্স্‌, ‘ওখানে গিয়ে কার ক্ষতিটা হয়েছে শুনি?’
তিনটে মহিলা আর একটা লোকের’, গম্ভীরভাবে বলল মেষপালক।‘এখন আমার কথাখানা মন দিয়ে শোনো । এ চত্তরটা আমার জানা আছে, তোমাদের তা নয়, তাই আমি অনেককিছুই বলতে পারি : গত দশ বছরে না একটা ভেড়া চড়তে দেখা গেছে , না কোনো চাষবাস হয়েছে— যদিও জমি ভাল। এখান থেকে নিশ্চই ভাল করেই দেখতে পাচ্ছ রাজ্যের নোংরা-আবর্জনায় জায়গাটার কী দশাখানা হয়েছে। তোমার, বাপু একটা দূরবিন আছে তো’, উইলফ্রেড পিপ্সক্যুয়েককে সে বলল, ‘ওখানা দিয়ে এমনিই বলা যায়।’

‘হ্যাঁ, ঠিকই,’ বলল উইলফ্রেড, ‘কিন্তু আমিতো কতকগুলো পথের রেখা দেখতে পাচ্ছি, নিশ্চই কেউ ওই পথ দিয়ে গেছে কোনো একসময়।’

‘পথের রেখা !’— মেষপালক বলল । ‘আমার বিশ্বাস তোমার কথাখানা সত্যি ! চারটে রাস্তা : তিনটে মহিলা আর একটা পুরুষ।’

‘তিনজন মহিলা আর একজন পুরুষ বলতে কি বোঝাতে চাইছেন ?’—এই প্রথমবারের জন্য মেষপালকের দিকে ঘুরে স্ট্যানলি বলল (এতক্ষন পর্যন্ত সে তার দিকে পিছন ফিরে দাঁড়িয়েছিল : অসভ্যতার একখানি)।



‘মানে ? কেন ওই যে বললুম : ‘তিনটে মহিলা আর একটা পুরুষ।’

‘এরা কারা?’—জিজ্ঞেস করল অ্যালজার্নন্‌ । ‘তারা সেখানে কেন যায় ?’

‘হয়ত কেউ কেউ বলতে পারবে তারা কে ছিলো’— বললে মেষপালক, ‘কিন্তু আমার আসার অনেক আগেই তাদের দিন ফুরিয়েছে এবং এখনো তারা কেন যায় তা বলা মানুষের বাচ্চার কম্ম নয় : এছাড়া আমি শুধু শুনেছি, জীবদ্দশায় তারা মোটেই ভাল লোক ছিল না।’

‘হে ঈশ্বর, কি উদ্ভট ব্যাপার !’— অ্যালজার্নন্‌ আর উইলফ্রেড বিড়বিড় করে বলল : কিন্তু স্ট্যানলির তিক্ত মেজাজ অবজ্ঞায় ভরে উঠল।

‘কেন, আপনি কি বলতে চান তারা সব মড়া ? যত্ত আজগুবি ! ভারী বোকা লোক তো এইসব বিশ্বাস করছেন । আমি জানতে চাই কে দেখেছে তাদের?’

‘আমি যে দেখেছি বাবুরা !’— মেষপালক বলল, ‘ওই নীচু জায়গাটার কাছে দেখেছি, আর ওই একই সময় আমার বুড়ো কুকুরটা যদি কথা বলতে পারত তবে সেও বলত তোমাকে । তখন চারটে বাজে, এরকমই একটা দিন । আমি দেখলাম তারা একে একে ঝোপের আড়াল থেকে গুড়ি মেরে বেরিয়ে এসে খাড়া হয়ে দাঁড়াচ্ছে । তারপর আস্তে আস্তে এই পথ ধরে মাঝের ওই গাছগুলোর দিকে চলে যাচ্ছে, যেখানে কুয়োটা আছে ।’

‘আর তারা কিরকম ছিল ? বলুন !’—অধীর আগ্রহে বলল অ্যালজার্নন্‌ আর উইলফ্রেড।

                        

হাড়জিজ্জিরে আর ছেঁড়া কাপড়-ঢাকা, বাবুরা : চারজনেরই : ছেঁড়া কাপড় আর সাদা হাড় খালি । মনে হচ্ছিল যেন, এখনি খট্‌ খট্‌ শব্দ শুনতে পাব । খুব ধীরে ধীরে তারা এদিক ওদিক চাইতে চাইতে চলে গেল ।’

‘তাদের মুখগুলো কেমন ছিল ? দেখতে পেয়েছিলেন?’

‘মুখ বলে তাদের তেমন কিছু ছিল না,’ মেষপালক বলল ‘তবে তাদের দাঁত আছে বলে মনে হয়েছিল ?’

‘হে ভগবান !’ — বললে উইলফ্রেড, ‘আর গাছের কাছে গিয়ে তারা কি করল ?’

‘তা বলতে পারব না, স্যার,’—মেষপালক বলল, ‘আমি আর সেখানে দাঁড়াইনি, যদিও বা থাকতাম, কিন্তু আমার কুকুরটার কথা খেয়াল হতে দেখি সে পালিয়েছে ! এর আগে সে কখনো আমাকে ছেড়ে এমনটি যায়নি । কিন্তু এখন সেটাই করেছে এবং শেষমেশ যখন তার কাছে এলাম, মনে হল যেন আমাকে চেনেই না । আমার গলায় চড়াও হবারও চেষ্টা করতে গেল । কিন্তু আমার কথায় কিছুক্ষনের মধ্যে তার হুঁশ ফিরল, তখন বাচ্ছাছেলের মত ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গিতে গুরিমেরে কাছে এগিয়ে এল। আমি তাকে ওভাবে আর কখনো দেখতে চাই না, অন্য কোনো কুকুরকেও নয়।’  

 



 

কুকুরটা উঠে এসে এতক্ষন বন্ধুত্ব করে বেড়াচ্ছিল; এখন সে তার মনিবের দিকে চেয়ে তার কথার পূর্ণ সমর্থন করল।

ছেলেরা এতক্ষন যা শুনলো সেটাই চিন্তা করছিল : অতঃপর উইলফ্রেড বলল— ‘আর ওটাকে কাঁদুনে কুয়ো কেন বলে?’

‘তুমি যদি শীতকালে সন্ধেবেলায় হেথায় আসতে তাহলে আর জিজ্ঞেস করার দরকার হত না’—মেষপালক বলল।

‘ভাল, কিন্তু আমি এর একবর্ণও বিশ্বাস করি না’, বলল স্ট্যানলি জাডকিন্স্‌, ‘পরের সুযোগে আমি যাবইঃ নইলে রদ্দা খাব ।’

‘তাহলে তুমি আমার কথা শুনবে না?’ মেষপালক বলল । ‘তোমার মাষ্টাররা সাবধান করার পরও? এখন এসো বাবুরা, আমার মনে হয় তোমার বুদ্ধিশুদ্ধি লোপ পেয়েছে । ঝুরিঝুরি মিথ্যে কথা বলে আমার কি লাভ? কেউ সেথায় গেলে আমার ছ-আনাও আসবে যাবে না । কিন্তু একটা জোয়ান ছেলেকে বসন্তের শুরুতেই ঝরে যাবে তা দেখতে পারব না ।’

‘আমার মনে হয় এটা ছ-আনার থেকেও বেশি কিছু’, বলল স্ট্যানলি । ‘আমার মনে হয় আপনি সেখানে কিছু একটা পেয়েছেন, তাই কাউকে কাছে ঘেঁষতে দিতে চান না । জঘন্য । চলে আয় তোরা ।’

তারা পিছু ফিরল । অন্য দুজন মেষপালককে ‘শুভসন্ধ্যা’ ও ‘ধন্যবাদ’ বলল, কিন্তু  স্ট্যানলি কিছুই বলল না । মেষপালক কাঁধ ঝাঁকিয়ে বিমর্ষভাবে সেদিকে চেয়ে রইল ।



 

ফেরার পথে তুমুল তর্ক বাঁধল । স্ট্যানলি কে বলা হল যে সে কুয়োর ধারে গেলে সেটা নির্বুদ্ধিতার পরিচয় হবে ।

সেদিন সন্ধ্যায় মি. বিশলি রবিনসন্‌ সকলকে জিজ্ঞেস করলেন সব ম্যাপে লাল গণ্ডি আছে কিনা । ‘বিশেষকরে’— তিনি বললেন ‘ওর ভিতরে ঢোকার চেষ্টাও করবে না।

 

অনেক গলার মধ্যে স্ট্যানলি জাডকিন্স্‌ ব্যাজার গলায় বলল, ‘কেন নয়, স্যার?’

‘না বলেছি তাই’ —বললেন মি. বিশলি রবিনসন্‌, ‘আর সেটা যদি যথেষ্ট না হয় তাহলে আমার কিছু করার নেই ।’ তিনি ঘুরে মি ল্যাম্বার্টের সঙ্গে নীচু গলায় কথা বললেন। তারপর বললেন,’ এই আমার বলার ছিল : আমাদের স্কাউটদের ওই মাঠের থেকে সাবধান করতে বলা হয়েছে, আমাদের উচিত সেটা মান্য করা— আশাকরি তোমরা সকলে একমত ।’

সবাই বলল, ‘হ্যাঁ, স্যার !’ শুধু স্ট্যানলি জাডকিন্স্‌ বাদে । সে বিদ্রুপ করে বলেছিল, ‘ওদের মান্য করব না, ছাই !’

 

পরের দিন বিকেলের দিকে শোনা গেল : ‘উইলকক্স , সব তাঁবু ঠিক আছে ?’

‘না, স্যার, জাডকিন্স্‌ নেই !’

‘এই ছেলেটা আমার দেখা মোস্ট জঘন্য আপদ ! সে কোথায় থাকতে পারে বলে মনে হয় ?’

‘কোনো আইডিয়া নেই, স্যার।’

‘আর কেউ জানে ?’

‘স্যার, ও কাঁদুনে কুয়োর কাছে গেলেও অবাক হব না ।’

‘কে ও?  পিপ্সক্যুয়েক ? কাঁদুনে কুয়োটা আবার কি ?’



‘স্যার, মাঠের মধ্যে ওই জায়গাটা —স্যার, ওই রুক্ষ প্রান্তরে যেখানে গাছগুলো জটলা করেছে সেইখানে।’

‘তুমি বলতে চাও লাল গণ্ডির ভিতরে ? হায় ভগবান ! তোমার কেন মনে  হল সে ওখানেই গেছে ?’

‘কেন, সে গতকাল ওটার সম্বন্ধে খুব আগ্রহী ছিল । আমাদের এক মেষপালকের সাথে কথা হচ্ছিল, সে আমাদের অনেক কিছু বলল আর সেখানে যেতে মানা করল । কিন্তু জাডকিন্স্‌ তাকে বিশ্বাস করেনি, সে বলেছিল সে যাবেই ।’

‘আহাম্মক !’ — বললেন মি. হোপ জোন্স, ‘সে কি সাথে কিছু নিয়ে গেছে?’

‘হ্যাঁ, সে একটা দড়ি আর একটা ক্যান নিয়ে গেছে । আমার বলেছিলাম কাজটা বোকার মত হচ্ছে ।’

‘মূর্খ ! এরকম অপকম্মটি করে কোন অভিশাপ ডেকে আনতে চায় ! ঠিক আছে, এস আমার সঙ্গে — তোমরা তিনজন । আমাদের অবশ্যই তাকে দেখা উচিত । কেন যে এরা সহজ আদেশটুকু মানতে পারে না কে জানে? সেই লোকটা তোমাদের কি বলেছিল?  না, এখন না, যেতে যেতে শুনব । বেশি দেরি করা ঠিক হবে না ।’

রওনা হবার পর — অ্যালজার্নন্‌ আর উইলফ্রেড চটপট সব বলে গেল আর অন্য দুজন মুহুর্মুহু বাড়তে থাকা উদ্বেগ নিয়ে তা শুনল । অবশেষে তারা আগের দিন মেষপালকের বলা সেই মাঠ এড়িয়ে নীচে পৌঁছালো । এখান থেকে পুরো জায়গাটা দেখা যায়; ঝোপের বাঁকে, প্যাঁচালো স্কচ্‌ ফার বৃক্ষের মধ্যে কুয়োটা অনায়াসে চোখে পড়ে । আর চোখে পড়ে রুক্ষ কাঁটাঝোপের মধ্যে চারটে পথের রেখা ।

চমৎকার দিন । ঝাঁ ঝাঁ রোদ্দুর । সমুদ্রটাকে একটা ধাতব-মেঝের মতো দেখাচ্ছে । একটুও হাওয়া বইছে না । ওপরে উঠে তারা বেদম হয়ে উত্তপ্ত ঘাসে চিতিয়ে পড়ল।

‘এখনো তো তার দেখা নেই,’—বললেন মি. হোপ জোন্স, ‘তবে আমাদের এখানে একটু থামতেই হবে । আমার কথা ছেড়ে দাও, তোমরা ওপর থেকে চারপাশে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখো,’ তার কিচ্ছুক্ষন পর আবার বললেন, ‘আমার মনে হয় আমি ওই ঝোপটা নড়তে দেখলাম ।’

‘হ্যাঁ, আমিও’—বলল উইলকক্স ।‘দেখুন…. না, ওটা সে হতেই পারে না । কেউ একটা মাথা উঁচাচ্ছে না?’

‘তাই তো মনে হচ্ছে, তবে নিশ্চিত নই ।’

কিছুক্ষন সব চুপ। তারপর:

‘ওটা ওই নিঃসন্দেহে,’ বলল উইলকক্স ‘ওই যে দূরে বেড়ার ওপারে । দেখতে পাচ্ছিস্‌ না ? একটা চকচকে কি রয়েছে । সেই ক্যান-টা বোধহয় যার কথা বলছিলিস্‌।

‘হ্যাঁ, সেই বটে, সোজা গাছগুলোর দিকে যাচ্ছে ।’ — বলল উইলফ্রেড।

এমন সময়ে অ্যালজার্নন্‌— যে সর্বশক্তি দিয়ে তাকিয়েছিল, চিৎকার করে উঠল ।

‘পথের ওপর ওটা কি ? চারটের ওপরেই — ওঃ! এ যে সেই মহিলা। ওঃ!  আমি আর দেখতে পারছি না । এটা হতে দিও না !’

তারপর সে মাটিতে গড়িয়ে পরে ঘাসগুলো খামচে ধরে মাথা কুটতে লাগল।

‘থামাও !’— চেঁচিয়ে উঠলেন মি. হোপ জোন্স— কিন্তু বৃথাই ।

‘এদিকে তাকাও,’ তিনি বললেন, ‘আমাকে ওখানে যেতেই হবে । উইলফ্রেড, তুমি এখানে থাকো, ছেলেদের খেয়াল রাখো । আর উইলকক্স তুমি যত জোরে পার দৌড়ে ক্যাম্পে যাও, সাহায্য চাইতে ।’

তারা দুজনেই ছুটে চলে গেল । উইলফ্রেড অ্যালজার্ননের সাথে একা রয়ে গেল এবং তাকে যথা সম্ভব শান্ত করার চেষ্টা করল, যদিও সে নিজেও খুব একটা খুশি ছিল না । সময়ে সময়ে সে পাহাড় থেকে মাঠের দিকে দেখতে লাগল । সে দেখল মি. হোপ জোন্স দ্রুতগতিতে আরো কাছে এগিয়ে যাচ্ছে, আর তারপর সে অবাক হয়ে দেখল তিনি দাঁড়িয়ে পড়লেন, ওপরে তাকিয়ে চারপাশে চোখ বুলিয়ে কোনাকুনি বেঁকে দ্রুত চলে গেলেন । কারনটা কি ? সে মাঠের উপর তাকাল । আর তাকিয়েই দেখল এক ভয়ানক অবয়ব — কালো জরাজীর্ণ কিছু একটা, মাঝে মাঝে সাদাটে ছোপের মত বেড়িয়ে পড়েছে : মাথাটা সরু লম্বা ঘাড়ের ওপর দাঁড় করানো । তার অর্ধেকটা ঢাকা কালো রঙের বেঢপ একটা আবরণে । জীবটি তার লিকলিকে হাতখানা এগিয়ে আসতে থাকা উদ্ধারকারীর দিকে দোলাচ্ছিল, যেন তাকে ছুঁড়ে ফেলারই জন্য আর সেই দুই অবয়বের মাঝে বাতাস আন্দোলিত হচ্ছিল, ঝক্‌মক্‌ করছিল— যেমনটা সে আগে কখনো দেখেনি। আর যেই না সে দেখল অমনি তার মাথার মধ্যে একটা আলোড়ন, গড়বড় শুরু হয়ে গেল। সে বুঝল এটা ওই প্রভাবের এত্তিয়ারে থাকার ফল। সে ঝটতি অন্যদিকে চাইল । দেখল স্ট্যানলি জাডকিন্স্‌ দ্রুত স্কাউটদের ভঙ্গিতে ঝোপের দিকে এগিয়ে চলেছে সতর্ক পদক্ষেপে — শুকনো ডাল মাড়িয়ে, কাঁটাঝোপ ঠেলে।



স্পষ্টতই, যদিও সে কিছু দেখেনি তবুও সে সন্দেহ করেছে কেউ ঘাপটি মেরে আছে ।তাই সে যথাসম্ভব নিঃশব্দে যাওয়ার চেষ্টা করছিল । উইলফ্রেড সবই দেখছিল, এবং সে আরো কিছু দেখল। হঠাৎ বিষম আতঙ্কে তার চোখে পড়ল, গাছগুলোর আড়ালে কেউ একটা অপেক্ষা করছে :  আবার একজন — আরেকটা বীভৎস কৃষ্ণবর্ণ অবয়ব — মাঠের অপরদিকের পথ ধরে নিঃসাড়ে এগিয়ে আসছে এদিক ওদিক তাকাতে তাকাতে, যেমনটা সেই মেষপালক বলেছিল। সবচেয়ে খারাপ, সে দেখল চতুর্থ আরেকজনকে — এবারে নিঃসন্দেহে একটা লোক —হতভাগা স্ট্যানলির পিছনে কয়েক গজ দূরে ঝোপের মধ্যে থেকে উঠে আসছে । যেন বহু কষ্টে সে পথ বেয়ে হামাগুড়ি দিয়ে চলেছে। সবদিক থেকে বেচারি শিকার একেবারে নিঃসহায় ।



উইলফ্রেড তার জ্ঞানবুদ্ধির শেষ সীমায় পৌঁছেছিল । সে একছুটে অ্যালজার্ননের কাছে গিয়ে তাকে ঝাকুনি দিল । ‘ওঠ, ওঠ’, সে বলল। ‘চেঁচা !, যত জোরে পারিস্‌ চেঁচা। ওঃ যদি একটা হুইসেল পেতাম !’

অ্যালজার্নন একসঙ্গে নিজেকে তুলল । ‘ওই যে ওখানে একটা,’ সে বলল, ‘উইলকক্সের : মনে হয় ফেলে গেছে।’

 এবার একজন হুইসেল দিল আর অন্যজন চিৎকার করতে লাগল। নিশ্চল বাতাসে ভেসে গেল তাদের শব্দ। স্ট্যানলি শুনতে পেয়ে দাঁড়াল । তারপর পিছন ফিরল । এরপর একটা তীব্র বীভৎস চিৎকার শোনা গেল যা পাহাড়ের উপরে থাকা কারও গলা দিয়ে বেরোবার নয় । কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে । স্ট্যানলির পিছনে গুড়িমারা অবয়বটা তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে কব্জিটা ধরে ফেলল । যে ভয়ঙ্করটি দাঁড়িয়ে হাত নাড়ছিল সে আবার উল্লাসে হাত নাড়াতে শুরু করল। যে গাছের মধ্যে ওঁতপেতে ছিল সে এবার এগিয়ে এসে হাত বাড়াল যেন এগিয়ে আসা কিছু একটা ধরবে বলে, আর সবচেয়ে দূরেরটা আহ্লাদে আটখানা হয়ে মাথা নাড়তে নাড়তে দ্রুত ধেয়ে এল।  



ছেলেরা কিছুক্ষনের ভয়ঙ্কর নীরবতার মধ্যে দম বন্ধ করে দেখতে লাগল মানুষগুলো আর তাদের শিকারের মধ্যে ভয়াবহ লড়াই । স্ট্যানলি তার একমাত্র হাতিয়ার ওই ক্যানটা দিয়ে আঘাত করল । ধুরধুরে কালো টুপি খানা খুলে পড়ল প্রানীটার মাথা থেকে । বেড়িয়ে পড়ল একটা সাদা খুলি, যাতে সম্ভবত চুলের ছাপ ।



এমন সময় মহিলাগুলোর একজন ওদের মধ্যে এসে পড়ল আর স্ট্যানলির গলায় দড়ি পড়িয়ে টান দিল । কয়েকমুহুর্তেই ওরা তাকে পরাস্ত করল, বীভৎস চিৎকার থেমে গেল আর তারপর তিনজন ফারের ঝোপে মধ্যে অদৃশ্য হল ।

তবু মনে হল হয়ত সাহায্য এসে পড়বে । মি. হোপ জোন্স, দ্রুত এগোচ্ছিলেন, হঠাৎ থামলেন, ঘুরে যেন চোখ রগড়ালেন, আর তারপরেই মাঠের দিকে দৌড়াতে লাগলেন । আরো :  ছেলেরা তাদের পিছনে দেখল শুধুমাত্র ক্যাম্পের দলই নয় তাদের সামনে মেষপালক ও উঠে আসছে তাদের পাহাড়টার ঢাল বেয়ে। তারা ইশারা করল, চেঁচাল, তাদের দিকে কয়েক গজ এগিয়ে গেল, আবার ফিরে এল। সেও পা মেলাল।

আরেকবার ছেলেরা মাঠের দিকে তাকাল । কোথাও কিছু নেই, নাকি গাছগুলোর মধ্যে কিছু আছে? গাছের মধ্যে অত কুয়াশা কেন ? মি. হোপ জোন্স ঝোপের মধ্যে ঝাঁপিয়ে

পড়ে আড়াল হয়ে গেলেন ।

মেষপালক তাদের পাশে দাঁড়িয়ে হাঁপাচ্ছিল । তারা ছুটে গিয়ে তার হাত ধরল করল ।

‘ওরা তাকে বাগে পেয়েছে ! ওই গাছের মধ্যে !’ বারবার সেই একই কথা তারা বলে চলল।

‘কি? কালকে আমার পইপই করে বলার পরও সে ওখানে গেছে ? বেচারা ছেলে ! বেচারা ছেলে !’ সে আরও কিছু বলত কিন্তু আরো শব্দে তা ধামাচাপা পড়ে গেল। ক্যাম্প থেকে উদ্ধারকারীর দল এসে পৌঁছেছে । কয়েকটা চটপট কথা সেরে নিয়ে তারা একসঙ্গে পাহাড় বেয়ে নীচে নেমে চলল।

মাঠে ঢুকেই তারা মি. হোপ জোন্সের দেখা পেল । তার কাঁধে ঝুলছে স্ট্যানলি জাডকিন্সের লাশ । তিনি ওটা গাছের ডাল থেকে কেটে আনেন । সেখানে ওটা ঝুলছিল আর এদিক ওদিক দুলছিল । শরীরে একফোঁটাও রক্ত নেই ।



পরের দিন মি. হোপ জোন্স একটা কুড়ুল নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন বাদারের সব গাছ কেটে সাফ করে, প্রত্যেকটা ঝোপ পুড়িয়ে দেবেন বলে । ফিরে এলেন হাতল-ভাঙা কুড়ুল আর পায়ে একটা কদর্য ক্ষত নিয়ে । একটা আগুনের ফুলকিও জ্বলেনি, এবং গাছে একটা আঁচড়ও কাটতে পারেননি ।

আমি শুনেছিলাম কাঁদুনে কুয়োর মাঠের বর্তমান জনসংখ্যা বলতে তিনজন মহিলা, একজন পুরুষ আর একটি ছেলে।



অ্যালজার্নন্ ডি মন্টমোরেন্সি আর উইলফ্রেড পিপ্সক্যুয়েক এর মানসিক ধাক্কাটা ছিল গুরুতর । দুজনেই তৎক্ষনাৎ ক্যাম্প ছেড়ে একেবারে চলে গেল । আর যারা রয়ে গেল নিঃসন্দেহে ঘটনাটা তাদের মধ্যে ছড়িয়ে দিল— বন্ধু হারানোর বিষাদ ।

 সবচেয়ে প্রফুল্ল ছিল জাডকিন্সের ভাই ।

সুধীবৃন্দ, এই ছিল স্ট্যানলি জাডকিন্সের আর আংশিক আর্থার উইলকক্সের কেরিয়ারের গল্প । আমার বিশ্বাস এটা আগে কখনো বলা হয়নি । যদি এর মধ্যে কোনো নীতিকথা থাকে তবে আমার মনে হয় সেটা সুষ্পষ্ট : তা যদি না হয় তাহলে আমি সত্যিই জানিনা আর কিভাবে তা বলব ।

 



মন্টেগু রোডস্ জেমস (১৮৬২-১৯৩৬)

মন্টেগু রোডস্‌ জেমস (১৮৬২-১৮৩৬) ছিলেন পণ্ডিতমহলে সমাদৃত মধ্যযুগীয় পুরাতত্ত্বের গবেষক।কিং’স কলেজের ডীন ও কেম্ব্রিজ ইউনিভার্সিটি ভাইস চান্সেলর ছিলেন । পরে ইটন কলেজের প্রোভোস্ট হন।আজীবন করেছেন গবেষনা ।প্রথম আলৌকিক গল্পের সংকলন ‘Ghost Stories of an Antiquary’. তাঁর গল্প সংকলন গুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘Ghost Stories of an Antiquary(1904)’, ‘More Ghost Stories of an Antiquary(1911)’, ‘A Thin Ghost and Others(1919)’, ‘A Warning to the Curious and Other Ghost Stories(1925)’ এবং একটি মাত্র গল্প নিয়ে ‘Wailing Well’  লিখেছেন ৩৪টি অলৌকিক গল্প যা তাঁর কথায় ‘Pleasing Terror’. তাঁর অলৌকিক গল্প এক নতুন ধারার জন্ম দিয়েছে যা ‘Jamesian’ নামে ক্ষ্যাত । এইচ পি লভক্রাফট, এডগার অ্যালান পো এর মত তাঁর নামও উচ্চারিত হয় ‘মাষ্টার আব ম্যাকাবার’ বলে ।

____________________________

 টীকা ও প্রসঙ্গ :

 

১. মূলগল্প ‘ওয়েলিং ওয়েল’, প্রথম প্রকাশ ১৯২৮ সালে ‘Wailing Well by M.R.James’ নামক ১৫৭ কপির সীমিত সংস্করণ বইতে।বেরিয়েছিল মিল হাউস প্রেস থেকে ।এই হল তার প্রচ্ছদ :



 

গল্পটি ওয়ারব্যারো বে, ডর্সেটে ২৭ শে জুলাই ১৯২৭ সালে স্কাউটদের ক্যাম্পে প্রথম পাঠ করা হয়। রেকর্ড আছে অনেক ছেলে সেই রাতে বেশ অস্বস্তি বোধ করেছিল কারণ গল্পের স্থানটি তাদের নিকট ছিল বলে।

 

২. টমাস কেন্‌ (জুলাই ১৬৩৭ - ১৯ মার্চ ১৭১১) ছিলেন একজন ইংরেজ আলেম, যাকে ইংরেজ বিশপদের মধ্যে সর্বাধিক বিশিষ্ট হিসাবে বিবেচনা করা হত এবং তিনি ছিলেন আধুনিক ইংরেজী স্তববিদ্যার অন্যতম জনক।

 

৩. প্রোভাস্ট হলেন ইটন কলেজের পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান। তিনি ক্রাউন দ্বারা নির্বাচিত এবং তাঁকে একটি ভাইস-প্রোভাস্ট এবং দশ ফেলো দ্বারা সহায়তা করা হয়।

 

৪. একজন স্কাউট (বালক স্কাউট বা পথিকৃৎ) সাধারণত ১১-১৮ বছর বয়সী,বিশ্বব্যাপী স্কাউটিং আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী বালক বা বালিকা উভয়েই হতে পারেন। মনস্তাত্ত্বিক বিকাশ এবং বয়সের বিস্তর পার্থক্যের জন্য ,অনেক স্কাউটিং সংস্থা এটাকে জুনিয়র এবং সিনিয়র এই দুটি ভাগে ভাগ করেছে।গড়ে ২০-৩০ জন স্কাউট সদস্যকে নিয়ে একটা স্কাউট দল গঠন করা হয় যার নেতৃত্বে এক বা একাধিক স্কাউট নেতা থাকেন। ছয় সদস্য করে স্কাউট দলকে আবার ভাগ করা হয় যারা বিভিন্ন চিত্তাকর্ষক এবং অনাভ্যন্তরীন কর্মকাণ্ডে অংশ নেয়।

 

. উইলিয়াম হোপ জোন্স ছিলেন ইটনের হাউস মাষ্টার ।আধিক পরিচিত ছিলেন ‘হো. জো.’ হিসেবে।এবং তার লেখা স্কাউটদের গান হল ‘The Woad Ode’.

 

৬. নীচের মাষ্টার বা লোয়ার মাষ্টার হলেন ইটনের ডেপুটি হেড মাষ্টার।১৯২৫ এ লোয়ার মাষ্টার ছিলেন Sir Clarence Henry Kennett Marten ।

 

৭. ওপিডান : স্কুলটি বাড়ার সাথে সাথে আরও শিক্ষার্থীদের কলেজের আসল ভবনের বাইরে ইটন শহরের অভ্যন্তরে বোর্ডিং-হাউসে বাস করার শর্তে আরও শিক্ষার্থীদের উপস্থিত হতে দেওয়া হয়েছিল। এই শিক্ষার্থীরা লাতিন শব্দ ওপিডিয়াম থেকে "শহর" অর্থাৎ ওপিডিয়ান নামে পরিচিতি লাভ করে। ঘরগুলি সময়ের সাথে ওপ্পিডিয়ানদের আরও অধিকতর সাধারণ উপায়ে আবাসনের ব্যবস্থা হিসাবে বিকশিত হয়েছিল এবং ১৮  এবং ১৯ শতকে গৃহকর্মীরা প্রশাসনের উদ্দেশ্যে আরও একটি নির্ভরশীল স্টাফের একজন  সদস্যের উপর নির্ভর করতে শুরু করেছিলেন, "ডেম" নামে পরিচিত স্টাফ , যারা ছেলেদের শারীরিক কল্যাণের জন্য দায়ী হয়েছিলেন। (কিছু বাড়ি আগে গৃহকর্তা ছাড়াই ডেম দ্বারা চালিত হত)। প্রতিটি ঘরে সাধারণত প্রায় ৫০ জন ছেলে থাকে। যদিও স্কুল ভিত্তিতে ক্লাসগুলি সংগঠিত করা হয়, বেশিরভাগ ছেলে তাদের বেশিরভাগ সময় তাদের বাড়িতে ব্যয় করে।

কলেজ নির্বাচনী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ সমস্ত ছেলেরা কিংসের স্কলার হতে পছন্দ করেন না, যার মধ্যে "কলেজ" এর নিজস্ব প্রাচীন ঐতিহ্য, গাউন পরা। এবং এই কারণেই অন্যান্য ছেলেদের থেকে কিছুটা পৃথক থাকতে হয় । যদি তারা ২৪ টি ওপ্পিডান বাড়ির একটি চয়ন করে তবে তারা ওপিডান স্কলার হিসাবে পরিচিত হয়।  স্কুল ও বাহ্যিক পরীক্ষায় ধারাবাহিকভাবে পার্থক্য করার জন্য ওপিডান বৃত্তি প্রদান করা হতে পারে। ওপ্পিডান বৃত্তি অর্জনের জন্য, একটি ছেলের অবশ্যই পুরো ক্যারিয়ার জুড়ে এক নাগাড়ে তিন বা চারটি পার্থক্য থাকতে হবে। স্কুলের মধ্যে, একটি ওপ্পিডান স্কলার পোস্ট-নামমাত্র অক্ষর ওএস ব্যবহারের অধিকারী।

 

. কুক্‌কুর বিল ১৯৫০ এর দশক অবধি ব্যবহৃত হত ইটনের সাঁতার পরীক্ষার আখড়া হিসেবে। ইটনের আসে পাশের জমিতে এমন অনেক দেখা যায়।

 

৯. হেনরি জর্জ লে ১৯২৬ সালে ইটনের গানের মাষ্টার ছিলেন।

 

১০. ইটন স্কুল ও কলেজ ইংল্যান্ডের বার্কশায়ারের উইন্ডসর এর নিকটে ইটনের ছেলেদের জন্য একটি ১৩-১৮ স্বতন্ত্র বোর্ডিং স্কুলএটি কেমব্রিজের কিং-কলেজের একটি ভগিনী প্রতিষ্ঠান হিসাবে কিং হেনরি ষষ্ঠ দ্বারা "কেঞ্জের কলেজ অফ আওয়ার লাডিয়ে অফ ইটন বেইসাইড উইন্ডসর" হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, এটি ১৮তম-প্রাচীনতম প্রধান শিক্ষক সম্মেলনে স্কুল হিসাবে তৈরি হয়েছিলইটনের ইতিহাস প্রভাব এটিকে বিশ্বের সর্বাধিক মর্যাদাপূর্ণ বিদ্যালয় হিসাবে পরিণত করেছে

 

১১. অমুক দেশের অমুক জেলা আসলে “Worbarrow Bay, Dorset”।

Comments

Post a Comment